"তোমার ওই বুড়ো বাপটাকে আর কতদিন সহ্য করতে হবে আমায়...."
"দেখো মালতী, বাবা তো আর কটা দিন বাঁচবেন, তারপর...."
"তোমার কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। একটা কাজও করে না বুড়ো, সংসারে এখন আর একটা টাকাও তো দেয় না। কোথায় ভেবেছিলাম তোমাকে বিয়ে করে শুধু তুমি আর আমি শান্তিতে বাস করব। কিন্ত আমাকে ওই বুড়োটার সেবা যত্ন করে খেটে মরতে হচ্ছে।"
এই ঘটনা নতুন নয়। বৌমার এই ধরনের কথাগুলো ঘনশ্যামের কান সওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্ত আজ যেন কথাগুলো তার বুকে কাঁটার মতো বিঁধল। কোনোরকমে বিছানা থেকে উঠে প্রাতঃভ্রমণের জন্য বেরিয়ে গেল সে।
আজ একটু বেশি হাঁটার জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। তার উপর বৌমার কথাগুলো তার অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে এই শীতেও ঘামিয়ে তুলল তাকে। তাই একটা গাছের তলায় বসে পড়ল ঘনশ্যাম। সকালটা এখন বেশ সুন্দর লাগছে তার। স্নিগ্ধ মনোরম বাতাস ও নাম না জানা পাখির কলরব ভরিয়ে তুলেছে সকালটাকে।
"আহঃ! কি শান্তি এখানে। বাড়ি ফিরেই তো আবার জর্জরিত হতে হবে বৌমার বাক্যবাণে। তার চেয়ে ভালো এখানেই কিছুটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যাক।"_ কথাগুলো মনে মনে বলল ঘনশ্যাম।
বেলা বেশ বেড়েছে। শহরের রাস্তাটাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সঙ্গে হালকা ক্ষিদেও পেয়েছে তার। এবার বাড়ি ফেরা দরকার।
ঘনশ্যাম বাড়ি ফিরে এসে দেখলো দীপায়ন বাড়িতে নেই, অফিসে গেছে হয়তো। বৌমা নিজের ঘরে। ক্ষুধার জন্য পেটের ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠলেও বৌমার সকালের আচরণের জন্য সে কিছু বলতে সাহস পেল না। ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ল নিজের বিছানায়।
শুয়ে শুয়েই ঘনশ্যাম শুনল ঘড়িতে পরপর বারোটা ঘন্টা পড়ল। মানে এখন দুপুর বারোটা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্নান সেরে নিলাম সে। রাস্তার ধারের বারান্দাটাই একটু রোদ এসে পড়েছিল। সেখানটাই গিয়ে দাঁড়াল সে।
দুপুরে অবশ্য নিরন্ন থাকতে হয়নি তাকে। খাবার টেবিলে ভাত দিয়ে বৌমা বলেছিল_ "আমি ভাত নিয়ে বসে থাকতে পারবো না, খাবার ইচ্ছা হলে এসে খেয়ে যেতে হবে।"
ঘনশ্যাম কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে উঠে এসেছিল।
বিকেলে ঘনশ্যাম নিজের ঘরে বসে সঞ্চয়িতা-র পাতা উল্টাচ্ছিল। তখন দীপায়ন ঘরে এসে ঢুকল। ঘনশ্যাম তার পায়ের শব্দ পেয়ে বলল- "দীপু, কিছু বলবি ?"
দীপায়ন কিছুটা সঙ্কোচের সঙ্গে বলল- "বাবা তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম।"
"তা বল না, কি বলতে এসেছিস ?"
"বাবা তুমি কিছু মনে করোনা। তোমার বৌমা বলছিল তোমাকে যদি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা যায়....। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। তাছাড়া আমি প্রতি মাসে গিয়ে তোমার খবর নিয়ে আসব।"_ কথাটা বলে দীপায়ন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
"দেখ দীপু, আমার বয়স হয়েছে। কাজকর্ম করতে পারি না, সংসারে টাকাও দিতে পারিনা। তাই তোরা আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে চাইছিস তো। দীপু এই বাড়িটা এখনো আমার। আমি চাইলে তোরা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবি। কিন্ত আমি সেটা করতে পারবো না। কারণ টা কি জানিস ? কারণ আমি তোর বাবা। তোদের কাছে আমি এখন বোঝা তাই না রে ? তোদেরকে আমার চিন্তা করতে হবে না। তুই এখন যা, আমাকে একটু একা থাকতে দে।"_ একটানা কথাগুলো বলল ঘনশ্যাম।
দীপায়ন কোনো কথা না বলে ঘর থেকে চলে গেল। কিছুক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থাকল ঘনশ্যাম। তারপর প্রায় আবছা হয়ে আসা চশমা ও পেতলের বাঁট লাগানো লাঠিটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। পড়ন্ত বিকেলের হালকা রোদে গঙ্গার ধারে কংক্রিটের বেঞ্চটায় গিয়ে বসল। আজকে জায়গাটা একদমই নিস্তব্ধ।
তার ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল_"বোঝা!" সত্যিই সে আজ পরিবারের বোঝা হয়ে উঠেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘনশ্যাম চাপা গলায় বলল- "সুষমা তুমি তো অনেকদিন আগেই ওদের বোঝার ভার কমিয়ে দিয়ে চলে গেছো। তোমার ছেলে আজ তার বাবার বোঝা বইতে অক্ষম। তাই আমিও তাদের বোঝা হালকা করে দেবো।"
দু'চোখ ছলছল করে উঠল ঘনশ্যামের। এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা বিষাক্ত মনে হল তার। চশমা আর লাঠিটা বেঞ্চে রেখে উঠে দাঁড়াল সে। চারিদিকটা একবার ভালো করে দেখে নিল।
হঠাৎ নিস্তব্ধ গঙ্গার জলে ঝপাৎ করে একটা শব্দ। তারপর সব মিলিয়ে গেল। ঘনশ্যাম তার পুত্র ও পুত্রবধূর কাঁধ থেকে বোঝা হালকা করে দিল।
সত্যিই তো, আজও কত পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মা তার সন্তানদের কাছে বোঝা হয়েই রয়ে গেল।
লেখক
অরিন্দম বিশ্বাস
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন