বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আলো

    ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে তাড়াতাড়ি জামাটা পাল্টে আবার বেরিয়ে গেল শাক্য। আজ অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁর মালিক আবার খুব খিটখিটে মেজাজের। সময় মতো না গেলে কথা শুনতে হবে। শাক্য কলেজের পড়া শেষ করে কলকাতায় এসেছে চাকরির সন্ধানে। সারাদিন বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরি করে, ইন্টারভিউ দেয় চাকরির আশায়। কিন্তু প্রতিবারই ভাগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। বিকেলে একটা রেস্তোরাঁতে ওয়েটারের কাজ করে নিজের ও পরিবারের খরচ  জোগায় শাক্য। 
    পরিবার বলতে আছে এক অসুস্থ মা ও এক বোন। বোনের বিয়ের বয়স হয়েছে। কিছুদিন আগেই শাক্য তার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। কারণ বোনের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, তাদের আপ্যায়ন করতে হবে। পাত্র সরকারি চাকরি করে। শাক্য ও তার মায়ের পাত্র পছন্দ। কিন্তু পাত্র মোটা রকম পণ না পেলে বিয়ে করতে রাজি নয়। দু'লাখ টাকা নগদ, সোনার গহনা, খাট-বিছানা, আসবাবপত্র এটা ওটা নিয়ে পাত্রের বিভিন্ন রকম আবদার দেখে মনে হতে পারে নিজেকে দরদামের জালে আবদ্ধ করে যেন নিজেকে বাজারের পণ্য করে তুলেছে। পাত্রের দরদাম শুনে শাক্যর বোন বিয়েতে মানা করে দিয়েছিল। কিন্তু শাক্য পাত্রের বাবাকে কথা দিয়েছে সে তাদের সব পণ মিটিয়ে দেবে বিয়ের দিন। আর তাই তার একটা কাজ খুব দরকার। 
    
    রেস্তোরাঁয় পৌঁছতেই মালিক বলল- "এরকম দেরী করে কাজে আসলে চলবে না। সময়মতো না আসতে পারলে তোমাকে আর কাজে রাখা যাবে না" ।
    শাক্য মাথা নীচু করে বলল- "সরি স্যার, আজ ইন্টারভিউ দিয়ে আসতে দেরী হয়ে গিয়েছে" ।
    রেস্তোরাঁর মালিক আবার জোর গলায় বলল- "তোমার ইন্টারভিউ এর জন্য তো আমি আমার ক্ষতি করতে পারব না"।
    শাক্য অনুরোধ জানালো- "আর দেরী হবে না স্যার, দয়া করে আমাকে কাজ থেকে বাদ দেবেন না" ।
    মালিক এবার একটু নরম হয়ে বলল- "ঠিক আছে যাও কাজ করো, এরপর থেকে যেন আর দেরী না হয়" ।
    শাক্য মাথা নীচু করে চলে গেল। রেস্তোরাঁ থেকে ফিরে নিজের জন্য চাল আর আলু একসাথে ফুটিয়ে নিল। প্রতিদিন বিভিন্ন রকম সুস্বাদু খাবার চোখে দেখে সে, নিজের হাতে অন্যদের টেবিলে সেগুলো পৌঁছে দেয়। কিন্তু তার কপালে সেই ভাত আর আলু।
    খাওয়া সেরে ঘুমানোর আগে বই পড়াটা শাক্যর নেশা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও একটা রবীন্দ্র উপন্যাস নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা নিয়ে দেখল সুমি ফোন করেছে।
    "হ্যাঁ সুমি বল"- ফোনটা ধরে বলল শাক্য। 
    ফোনের ওপার থেকে কন্ঠ ভেসে এল- "দাদা কিছুদিন হল মায়ের শরীর খারাপটা বেড়েছে, ওষুধ শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই যদি কিছু টাকা পাঠাতে পারিস তাহলে ওষুধ কেনা হত" ।
    শাক্য বলল- "ঠিক আছে, মাকে বলিস আমি দুদিনের মধ্যে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করবো। মা কি ঘুমিয়ে গিয়েছে ?"
    সুমি উত্তর দিল- "হ্যাঁ, তুই কথা বললে কালকে সকালে ফোন করবো" ।
    "থাক, আর ফোন করতে হবে না। আমি টাকা পাঠিয়ে দেব। মা'র খেয়াল রাখিস" ।
    "ঠিক আছে দাদা রেখে দিলাম " ।
    ফোনটা রেখে বইটা বন্ধ করে দিল শাক্য। আজ আর পড়তে ইচ্ছে করছে না। দুদিনের মধ্যে কিছু টাকা তাকে জোগাড় করতেই হবে।
    পরদিন সকালে কাজের খোঁজে অফিসে অফিসে না গিয়ে সে ঠিক করলো আজ তাড়াতাড়ি রেস্তোরাঁতে যাবে। একটু বেশি কাজ করে কিছু টাকা জোগাড় করতে হবে। সেদিন এত তাড়াতাড়ি শাক্যকে রেস্টুরেন্টে দেখে মালিক জিজ্ঞেস করলেন- "কী ব্যাপার শাক্য, আজ এত তাড়াতাড়ি ?"
    শাক্য দেখলো মালিকের মনটা আজ ভালো আছে। তাই কথাটা সে বলে ফেলল- "স্যার মায়ের অসুখটা বেড়েছে। ওষুধ কিনতে হবে। আপনি যদি অগ্রিম কিছু টাকা দেন, তাহলে....। আমি বেশি বেশি কাজ করে শোধ করে দেব" ।
    মালিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল- "ঠিক আছে, যাওয়ার সময় হাজার চারেক টাকা নিয়ে যেও" ।
    শাক্য বিনয়ের সাথে বলল- "স্যার আমার খুব উপকার করলেন। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ " ।
    মালিক বলল- "ঠিক আছে, এখন যাও কার কি লাগবে দেখো" ।
    পরদিন টাকাটা ট্রান্সফার করে দিয়ে সুমিকে ফোন করলো শাক্য-
    "হ্যাঁ দাদা বল" ।
    "টাকাটা পেয়েছিস ?"
    "হ্যাঁ পেয়েছি" ।
    "ঠিক আছে তাহলে মায়ের ওষুধ আর যা যা লাগবে কিনে নিস" ।
    "ঠিক আছে" ।
    "মায়ের দেখাশোনা করিস ভালো করে, এখন রাখছি" ।

    বিভিন্ন অফিস ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে শাক্য। কিন্তু সকল জায়গাতেই বিধাতা বিমুখ। সে ভাবতে থাকে শিক্ষার কোনো মূল্যই নেই বর্তমান সমাজের কাছে। যে কোনো কাজ পেতে গেলে এখন হয় টাকা থাকতে হবে নয়তো ঘনিষ্ঠ মহল। যার কোনোটাই তার নেই। উপযুক্ত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সব অফিসেই কোনো না কোনো দুর্বলতা দেখিয়ে শাক্যকে বঞ্চিত করা হয়। বিত্তবান শ্রেণীরা চিরকালই দ্রারিদ্রের প্রতি নির্দয়। 
    সরকারও নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। ভাবী যুবসমাজের প্রতি সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। প্রতিটি রাজনৈতিক দল উচ্চ ভাষণে মঞ্চ মাতিয়ে তোলে। কিন্তু গরীবের দুঃসময়ে সবাই হয়ে যায় ডুমুরের ফুল। আর গরীব, অসহায় মানুষগুলো বসে থাকে তীর্থের কাক হয়ে।
    এইসব ভাবতে ভাবতে শাক্যর মনে আশার আলো যখন প্রায় অস্তমিত তখন একটা চিঠি এসে পৌঁছলো। শাক্য চিঠিটা খুলে দেখলো একটা কর্পোরেট কোম্পানী তাকে ইন্টারভিউ এর জন্য ডেকেছে। পরদিন সে ভালো করে প্রস্তুতি নিয়ে কোম্পানীর অফিসে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ম্যানেজার তার ঘরে ডাকলেন শাক্যকে। কিছু প্রাথমিক কথোপকথনের পর ম্যানেজার শাক্যকে বললেন- "অভিনন্দন! আজ থেকে আপনি আমাদের কোম্পানীর প্রোডাক্ট ইনচার্জ। আগামীকাল থেকে নতুন কর্মজীবন শুরু করুন " ।
    
প্রথম দিন কাজে গিয়ে নিজের দায়িত্ব বুঝে নিল শাক্য। অফিসে প্রথম দিন, তাই সমস্ত দিক দেখাশোনা করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। অফিস থেকে বেড়িয়ে সে ফোন করে বাড়িতে খবরটা দিল- 
    "হ্যালো ! সুমি তাড়াতাড়ি মাকে ফোনটা দে" ।
    সুমি বলল- "হ্যাঁ ধর দিচ্ছি" ।
    "হ্যালো ! শাক্য, বল বাবা, কেমন আছিস ?" শাক্যর মা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
    "হ্যাঁ মা আমি ভালো আছি। তোমার শরীর ঠিক আছে তো?"
    "এখন বেশ ভালো বোধ করছি রে। তোর আর সুমির একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলে একটু শান্তি পায় রে বাবা" ।
    "মা তুমি আর চিন্তা করোনা। আমি একটা কোম্পানীতে চাকরি পেয়ে গিয়েছি"।
    "সত্যি বলছি বাবা শাক্য ?"
    "হ্যাঁ মা আমি সত্যি বলছি" ।
    "তাহলে এবার সুমির বিয়েটা হবে বল" ।
    "হ্যাঁ মা সব হবে, এবার খুব ধুমধাম করে সুমির বিয়ে দেবো, তুমি সাবধানে থেকো, আমি খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি আসছি, এখন রাখছি তবে"।
    ফোনটা রেখে শাক্য দেখলো চারিদিক বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বৃষ্টি হবে মনে হয়। রাস্তায় কোনো অটোও আসছে না। তাড়াতাড়ি পা চালাতে লাগলো শাক্য। কিছুদূর যেতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। শাক্য কিছুটা দৌড়িয়ে একটা বন্ধ দোকানের শেডের তলায় গিয়ে দাঁড়ালো। রাস্তার আলোতে পাশের বট গাছের ছায়া পড়ে একটা রোমাঞ্চকর আলো-আঁধারি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার কন্ঠে ধ্বনিত হল কবিগুরুর 'অনন্ত প্রেম'- 
    "তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার 
    জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার। 
    চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার-
    কত রূপ ধরে পড়েছো গলায়, নিয়েছ সে উপহার 
    জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার" ।

    শাক্য যখন কবিতায় মগ্ন তখন হঠাৎই একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ালো অপর প্রান্তে। ছায়ামূর্তিটি যে একজন নারী সেটা বোঝায় যায়। দেখে মনে হল বিবাহিতা। সিঁথিতে সিঁদুর, পরনে হালকা হলুদ রঙের শাড়ি। আবছায়া আলোতে যেটুকু দেখা যায় তাতে শাক্য ছায়ামূর্তিটিকে ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারলো। কারণ ঐ মুখ, ঐ চোখ, ঐ শরীরী ভাষা যে কোনোদিন ভোলার নয়। ছায়ামূর্তিটিও যে ওকে চিনতে পেরেছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হল না।
    বৃষ্টির জোড় আরো বেড়েছে। জলের ছিটা এসে দুজনেরই গায়ে লাগছে। পরস্পরের প্রতি দূরত্বটা আরো কমে এলো। চারিদিকে আলো-আঁধারি খেলা চলছে, রাস্তা নির্জন, একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ মিশে রয়েছে বাতাসে। দুজন দুজনের দিকে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে। চাইলেই অনেক কিছুই বলা যেত- কিন্তু একটা কথাও বলা গেলো না।
    দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে রইল। নিস্তব্ধ পরিবেশে শুধু বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। শাক্যর মনের ভিতর থেকে আপনা থেকেই বেরিয়ে এল 'একরাত্রি'-র একটি লাইন-
    "সুরবালা আজ তোমার কেহই নয়, কিন্তু সুরবালা তোমার কী না হইতে পারিত" ।
    সত্যিই সুরবালার মতো চন্দ্রাণীও শাক্যর কী না হতে পারত। একটা সময় চন্দ্রাণীই ছিল শাক্যর জীবনের অন্তরঙ্গ, সবচেয়ে নিকটবর্তী, তার জীবনের সমস্ত কিছুর ভাগীদার। সে আজ এত দূর, এত পর, আজ তাকে দেখা বা কথা বলা দোষের, তার বিষয়ে চিন্তা করা পাপ।
    শাক্য যখন কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র তখনই প্রথম আলাপ হয় চন্দ্রাণীর সাথে। তারপর ধীরে ধীরে আলাপ পৌঁছে যায় প্রেমালাপে। চন্দ্রাণীর বাবা বিষয়টা মেনে নেয়নি শাক্যদের পরিবারের অবস্থা জেনে। চন্দ্রাণী অনেকবার বলেছে 'চলো আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিই' । কিন্তু শাক্য প্রতিবারই তাকে মানা করেছে, বলেছে 'মা ও বোনকে ছেড়ে সে পালিয়ে যেতে পারবে না। তাছাড়া সে কাপুরুষের মতো পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে রাজি নয়। নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সম্মানের সাথে দুটো পরিবারকে এক করতে চায় সে' ।
    কলেজ শেষ হবার পর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি চন্দ্রাণীর সাথে। আজ আবার অনেকদিন পর এত কাছাকাছি এসেছে চন্দ্রাণী, কিন্তু অপরের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন তাদের দুজনকে মোহিত করে রেখেছে। চন্দ্রাণীর শরীরের মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছে শাক্য। চন্দ্রাণীও যেন আজ সমস্ত কিছু ছেড়ে তার জন্যই এসে দাঁড়িয়েছে তার কাছে। সারা জীবনের না পাওয়াকে ভুলিয়ে দিয়ছে এই ক্ষণিকের কাছে আসা। এই মুহূর্তটা শুধুই তাদের দুজনের। 
    বৃষ্টি থেমে এসেছে, আকাশও কিছুটা পরিস্কার হয়েছে। শাক্য মৃদু স্বরে প্রথম কথাটা বলল- "বৃষ্টি থেমে গিয়েছে" ।
    চন্দ্রাণী সম্বিত ফিরে পেল শাক্যর কথায়। আবছায়া আলোতেও তার চোখের কোনটা চিকচিক করে উঠল। কোনো কথা না বলে চন্দ্রাণী এক পা শাক্যর দিকে এগিয়ে এল তারপর নরম স্বরে বলল- "আমি আসি"। এরপর সে চলে গেল তার বাড়ির দিকে।
    এই ক্ষণকালটুকু শাক্যর জীবনে এক অনন্ত পাওয়া হয়ে রয়ে গেল। আজ এতগুলো ভালো তার জীবনে একসাথে আসবে সে ভাবতেই পারেনি। এই অন্ধকারেও শাক্যর মনে হাজার প্রদীপের আলো জ্বলে উঠল। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে দেখল মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ সমস্ত পৃথিবীটাকে আলোকিত করে তুলেছে, আর এক চাঁদ যেন শাক্যকে নতুন করে বাঁচার আলো দেখিয়েছে।


                                                       লেখক 
                                                  অরিন্দম বিশ্বাস 


রেফারেন্স: গীতাঞ্জলি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
                 শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বোঝা

  দেওয়ালের দোলক ঘড়িতে সবেমাত্র সকালের ছয়টার ঘন্টাটা পড়েছে। হঠাৎ একটা কোলাহলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ঘনশ্যামের। শীতের সকাল, তাই বিছানার মায়া ত্যাগ করতে ইচ্ছা করল না তার। বিছানায় শুয়েই সে শুনতে পেল তার পুত্রবধূর তীব্র ভর্তসনা। 
  "তোমার ওই বুড়ো বাপটাকে আর কতদিন সহ্য করতে হবে আমায়...."
  "দেখো মালতী, বাবা তো আর কটা দিন বাঁচবেন, তারপর...."
  "তোমার কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। একটা কাজও করে না বুড়ো, সংসারে এখন আর একটা টাকাও তো দেয় না। কোথায় ভেবেছিলাম তোমাকে বিয়ে করে শুধু তুমি আর আমি শান্তিতে বাস করব। কিন্ত আমাকে ওই বুড়োটার সেবা যত্ন করে খেটে মরতে হচ্ছে।"
  
  এই ঘটনা নতুন নয়। বৌমার এই ধরনের কথাগুলো ঘনশ্যামের কান সওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্ত আজ যেন কথাগুলো তার বুকে কাঁটার মতো বিঁধল। কোনোরকমে বিছানা থেকে উঠে প্রাতঃভ্রমণের জন্য বেরিয়ে গেল সে।
  আজ একটু বেশি হাঁটার জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। তার উপর বৌমার কথাগুলো তার অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে এই শীতেও ঘামিয়ে তুলল তাকে। তাই একটা গাছের তলায় বসে পড়ল ঘনশ্যাম। সকালটা এখন বেশ সুন্দর লাগছে তার। স্নিগ্ধ মনোরম বাতাস ও নাম না জানা পাখির কলরব ভরিয়ে তুলেছে সকালটাকে। 
  "আহঃ! কি শান্তি এখানে। বাড়ি ফিরেই তো আবার জর্জরিত হতে হবে বৌমার বাক্যবাণে। তার চেয়ে ভালো এখানেই কিছুটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যাক।"_ কথাগুলো মনে মনে বলল ঘনশ্যাম।
  বেলা বেশ বেড়েছে। শহরের রাস্তাটাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সঙ্গে হালকা ক্ষিদেও পেয়েছে তার। এবার বাড়ি ফেরা দরকার। 

  ঘনশ্যাম বাড়ি ফিরে এসে দেখলো দীপায়ন বাড়িতে নেই, অফিসে গেছে হয়তো। বৌমা নিজের ঘরে। ক্ষুধার জন্য পেটের ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠলেও বৌমার সকালের আচরণের জন্য সে কিছু বলতে সাহস পেল না। ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ল নিজের বিছানায়।
  শুয়ে শুয়েই ঘনশ্যাম শুনল ঘড়িতে পরপর বারোটা ঘন্টা পড়ল। মানে এখন দুপুর বারোটা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্নান সেরে নিলাম সে। রাস্তার ধারের বারান্দাটাই একটু রোদ এসে পড়েছিল। সেখানটাই গিয়ে দাঁড়াল সে।
  দুপুরে অবশ্য নিরন্ন থাকতে হয়নি তাকে। খাবার টেবিলে ভাত দিয়ে বৌমা বলেছিল_ "আমি ভাত নিয়ে বসে থাকতে পারবো না, খাবার ইচ্ছা হলে এসে খেয়ে যেতে হবে।"
  ঘনশ্যাম কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে উঠে এসেছিল। 

  বিকেলে ঘনশ্যাম নিজের ঘরে বসে সঞ্চয়িতা-র পাতা উল্টাচ্ছিল। তখন দীপায়ন ঘরে এসে ঢুকল। ঘনশ্যাম তার পায়ের শব্দ পেয়ে বলল- "দীপু, কিছু বলবি ?"
  দীপায়ন কিছুটা সঙ্কোচের সঙ্গে বলল- "বাবা তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম।"
  "তা বল না, কি বলতে এসেছিস ?"
  "বাবা তুমি কিছু মনে করোনা। তোমার বৌমা বলছিল তোমাকে যদি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা যায়....। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। তাছাড়া আমি প্রতি মাসে গিয়ে তোমার খবর নিয়ে আসব।"_ কথাটা বলে দীপায়ন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
  "দেখ দীপু, আমার বয়স হয়েছে। কাজকর্ম করতে পারি না, সংসারে টাকাও দিতে পারিনা। তাই তোরা আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে চাইছিস তো। দীপু এই বাড়িটা এখনো আমার। আমি চাইলে তোরা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবি। কিন্ত আমি সেটা করতে পারবো না। কারণ টা কি জানিস ? কারণ আমি তোর বাবা। তোদের কাছে আমি এখন বোঝা তাই না রে ? তোদেরকে আমার চিন্তা করতে হবে না। তুই এখন যা, আমাকে একটু একা থাকতে দে।"_ একটানা কথাগুলো বলল ঘনশ্যাম।
  দীপায়ন কোনো কথা না বলে ঘর থেকে চলে গেল। কিছুক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থাকল ঘনশ্যাম। তারপর প্রায় আবছা হয়ে আসা চশমা ও পেতলের বাঁট লাগানো লাঠিটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। পড়ন্ত বিকেলের হালকা রোদে গঙ্গার ধারে কংক্রিটের বেঞ্চটায় গিয়ে বসল। আজকে জায়গাটা একদমই নিস্তব্ধ। 
  তার ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল_"বোঝা!" সত্যিই সে আজ পরিবারের বোঝা হয়ে উঠেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘনশ্যাম চাপা গলায় বলল- "সুষমা তুমি তো অনেকদিন আগেই ওদের বোঝার ভার কমিয়ে দিয়ে চলে গেছো। তোমার ছেলে আজ তার বাবার বোঝা বইতে অক্ষম। তাই আমিও তাদের বোঝা হালকা করে দেবো।"
  দু'চোখ ছলছল করে উঠল ঘনশ্যামের। এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা বিষাক্ত মনে হল তার। চশমা আর লাঠিটা বেঞ্চে রেখে উঠে দাঁড়াল সে। চারিদিকটা একবার ভালো করে দেখে নিল।
  হঠাৎ নিস্তব্ধ গঙ্গার জলে ঝপাৎ করে একটা শব্দ। তারপর সব মিলিয়ে গেল। ঘনশ্যাম তার পুত্র ও পুত্রবধূর কাঁধ থেকে বোঝা হালকা করে দিল।
  সত্যিই তো, আজও কত পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মা তার সন্তানদের কাছে বোঝা হয়েই রয়ে গেল।


                                                          লেখক 
                                                    অরিন্দম বিশ্বাস 

অন্তরালে

      ছোট্ট থেকেই ডাক্তার হয়ে দুঃস্থ লোকেদের সেবা করাই ছিল পারমিতার স্বপ্ন। তাই হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেই প্রস্তুতি শুরু করে দ...