পুরাতন অশ্বথ গাছের নীচে বিশ্রাম নিচ্ছিল বাদশা। বয়স হয়েছে তাই আর বেশি পরিশ্রম করতে পারে না সে। নিস্তব্ধ তপ্ত দুপুরে এই গাছতলায় তার আশ্রয়। রহিম ডাক দিতেই চিঁ-হি স্বরে আওয়াজ করে ছুটে এলো বাদশা। রহিম তার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। রহিমের বাড়ি হল মুর্শিদাবাদ শহরের এক প্রান্তে একটি গ্রাম্য এলাকায়। বাদশার সাথে সাথে রহিমেরও বয়স হয়েছে। সে বিপত্নিক হয়েছে বছর পঁচিশ হল। তার সংসারে আছে এক ছেলে, ছেলের বউ আর তার জীবনের সঙ্গী বুড়ো ঘোড়াটা।
অভাবের সংসার রহিমের। ছোট থেকেই সে দেখে এসেছে চরম দুর্ভিক্ষ ও দুর্দিন। তার পূর্ব-পুরুষরা নবাবের জমিদারিতে দিন মজুরের কাজ করতো। নবাবদের দিন শেষ হয়েছে, জমিও হাত বদল হয়েছে। তাই আর জমিতে চাষ করে সংসারের হাল ধরা হয়নি রহিমের। এক সময় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করে সে। এক সন্তানের জন্ম দেবার পর এক কঠিন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরে তার স্ত্রী। কিন্তু টাকার অভাবে স্ত্রীর চিকিৎসা করে উঠতে পারে নি রহিম। অবশেষে তার স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে।
দারিদ্রের আতিশয্যে আর চলতে না পেরে অবশেষে সরকারের কাছে আর্জি জানিয়ে কিছু টাকা পায় রহিম। সেই টাকায় সে ঘোড়াটি কেনে স্থানীয় এক ঘোড়া ব্যাবসায়ীর কাছ থেকে। নবাবের শহর, তাই ঘোড়াটিরও নবাবী নামকরণ করা উচিত। অনেক ভেবে সে ঘোড়াটির একটা পছন্দসই নাম দিল - বাদশা। তার যত্নের কোনো ত্রুটি হতে দেয়নি রহিম। আস্তে আস্তে বড়ো হয়েছে বাদশা। শরীরের সাথে সাথে তার শক্তিও বুদ্ধির ও বৃদ্ধি হয়েছে। নামও তার যেমন বাদশা, তার চাল চলন ও আচরণও বাদশার মতোই।
এই বাদশাই রহিমের সংসারে দুবেলা অন্ন জুগিয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে ঘুরতে আসা মানুষজনকে তার কাঁধে করে বয়ে নিয়ে বেরিয়েছে মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে, নবাবের প্রাসাদে। সে যেমন পিঠে করে ভার বইতে পারতো, তেমনি ঘোড়া প্রদর্শনী বা ঘোড়দৌড় এও তার নাম থাকত সবার আগে। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় বাদশা মাঠে নামলে লোকজনের মুখে একটা কথায় শোনা যেত - "আজ খেতাব বাদশাই জিতবে"।
জীবনের পঁচিশটা বছর পার করে এসেছে বাদশা। বয়সের ভারে আজ সে জীর্ণ, শরীর শীর্ণকায়, শক্তি ও কমে এসেছে। সে আর পারে না দ্রুত দৌড়তে, পারে না মানুষকে পিঠে নিয়ে ঘুরতে।
রহিমের ছেলেও বড়ো হয়েছে। বছর দুয়েক হলো তার বিয়ে দিয়েছে রহিম। পুত্রবধূই এখন বাড়ির সমস্ত কাজ দেখাশোনা করে।
যৌবনকালে বাদশা কোনো অভাব বুঝতে দেয়নি রহিমকে। কিন্তু এখন সে আর পারে না। মানুষ ও আর টাঙাই উঠতে চায় না। ছোট দূরত্ব যেতে তাদের পছন্দ রিকশা বা টোটো। সবাই টোটো কিনেছে কিন্তু রহিম পারে নি তার পুরোনো পেশা আর বাদশাকে ছাড়তে। এ নিয়ে ছেলের বউ এর কাছে প্রতিদিন কথাও শুনতে হয় রহিমকে। পুত্রবধূ সটান তার মুখের উপর বলে দেয় - "সবাই টোটো কিনেছে, আপনি কেনো সেই মান্ধাতা আমলের টাঙা আঁকড়ে বসে রয়েছেন। বুড়ো ঘোড়াটা বিক্রি করে দিলেও তো দুটো পয়সা হয়।"
পুত্রবধূর কথায় আড়ালে চোখের জল ফেলে রহিম। উপর থেকে যিনি সব দেখছেন, তার দিকে মুখ তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে জিজ্ঞাসা করে রহিম - "হায় আল্লাহ! বুড়ো হলে কি সকলেরই এভাবে প্রয়োজন ফুরোয়। রোজগার না করতে পারলে কি তারও সংসারে প্রয়োজন ফুরত।"
বউমার বয়স অল্প, তার উপর এ সংসারে বেশিদিন আসেনি। তাই সে জানে না এ সংসারে বাদশার অবদান। বাদশার প্রতি বড়ো মায়া তার। সেই ছোট্ট থেকে বড়ো করে তুলেছে সে বাদশাকে। বাদশাও থেকেছে সব সময় তার সঙ্গে। বাদশার জন্য কোনোদিন তাকে অভুক্ত থাকতে হয় নি। কিন্তু আজ বাদশা বুড়ো হয়েছে বলে তাকে বিক্রি করে দেবে! কী করে তাকে অন্যের হতে তুলে দেবে সে! কিছু টাকা না হলে যে আর সংসার চলে না। জীবন আজ তাকে এক চরম সংকটে এনে ফেলেছে। টোটো কিনলে হয়তো সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরবে। কিন্তু বাদশাকে হারাতে হবে চিরতরে।
রহিমের ডাক শুনে বাদশা ছুটে আসে তার কাছে। রহিম জড়িয়ে ধরে বাদশাকে। অপাঙ্গে তাকায় তার দিকে। রহিম দেখে বাদশাও তার দিকে চেয়ে আছে সজল নয়নে।
এখন প্রায় দিনই অভুক্ত থাকতে হয় বাদশাকে। কিন্তু সে জন্য কোনো অভিযোগ তার নেই। দিন দিন খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে সে। আস্তে আস্তে চলার ক্ষমতা ও হারিয়ে ফেলে বাদশা। সে বুঝতে পারে, সে যেন এ সংসারে একটা দায় হয়ে পরেছে। যতদিন তার ক্ষমতা ছিল ততদিন সবার মন জুড়ে ছিল সে। কিন্তু এখন তার যাবার সময় হয়েছে।
অভাবের সংসারে রহিম ও আর পারে না বাদশার খাবার জোগাতে। রহিমের দিকে তাকিয়ে বাদশার দু-চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। বাদশাও চায় তার প্রভুর উপর থেকে তার অতিরিক্ত দায় মুছে ফেলতে।
সজল নয়নে রহিম এসে বসে তার পাশে। হাত বুলায় তার শরীরে। প্রভুর এই স্পর্শ টুকুর অপেক্ষাতেই যেন ছিল বাদশা। ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। রহিমের সংসার থেকে তার দায় মুছে ফেলতে এ পৃথিবীকে বিদায় জানায় বাদশা।
লেখক
অরিন্দম বিশ্বাস