ছোট্ট থেকেই ডাক্তার হয়ে দুঃস্থ লোকেদের সেবা করাই ছিল পারমিতার স্বপ্ন। তাই হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেই প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলো ডাক্তারি পরীক্ষার। পারমিতার বাবা স্কুলের শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তিনি যেমন নিষ্ঠাবান, তেমনই মেয়ের প্রতিও তার রয়েছে অগাধ স্নেহ।
মেয়ে বাইরে গিয়ে একা থাকতে পারবে কি না, বাইরের সবকিছু মানিয়ে চলতে পারবে কি না, বাইরে গিয়ে কোনো খারাপ প্রভাব তার উপর পরবে না তো, এইসব নানা চিন্তা - দুশ্চিন্তা কাটিয়ে অবশেষে পারমিতা মেডিকেল কলেজের ছাড়পত্র পেয়েই গেলো।
বীরভূমের একটি মফস্বল থেকে আগামী কয়েক বছরের জন্য পারমিতার ঠিকানা হলো বর্ধমান মেডিকেল কলেজের ছাত্রী আবাস। না, যতটা চিন্তা বাবা করছিল ততটা চিন্তার কোনো কারণ নেই। এক সপ্তাহ হোস্টেলে থাকার পর ভাবলো পারমিতা। পারমিতার সঙ্গেই অনেক জায়গা থেকেই অনেক মেয়ে এসেছে হোস্টেলে। তাদের অনেকের সাথেই খুব ভালো বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছে তার। তাদের মধ্যে একজন হলো কুহেলী, হোস্টেলে পারমিতার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
মেডিকেল কলেজে শিক্ষাজীবন শেষ করে পারমিতা তার কর্মজীবন শুরু করলো বোলপুরের একটি গ্রামীণ হাসপাতালে। বোলপুর জায়গাটা তার বরাবরই পছন্দের, আর সেখানেই কর্মজীবন শুরু করতে পেরে সে খুব খুশি। আজ তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ছোট থেকেই যে স্বপ্ন সে দেখতো আজ তা বাস্তব রূপে তার কাছে ধরা দিয়েছে। পারমিতা তার বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে পেরেছে।
ডাক্তার হিসেবে বোলপুর গ্রামীণ হাসপাতালে আজ তার প্রথম দিন। ডাক্তারি চেয়ারটাতে বসেই সে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু একটা ভাবছিল। হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে তার নামটা শুনে সেদিকে তাকালো, দেখলো কুহেলী এসেছে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে।
'' আরে কুহেলী তুই! আয় আয় ভিতরে আয়,'' উচ্ছসিত হয়ে বললো পারমিতা।
ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে কুহেলী বলল - '' বল কেমন আছিস? তুই তো এবার ডাক্তার হয়েই গেলি, তোকে তোর ডাক্তারি জীবনে অনেক অনেক অভিনন্দন।''
পারমিতা হেসে বলল - '' হ্যাঁ আমি তো ডাক্তার হয়ে গেলাম। আর তুই, তুই কবে জইন করছিস?''
কুহেলী বলল - '' এই তো অপেক্ষা চলছে, জইনিং লেটার পেয়ে গেলেই জইন করবো।''
পারমিতা বলল - '' হ্যাঁ জইন করে নে, তারপর তোর নামের পাশেও লেখা থাকবে ডক্টর কুহেলী।''
কুহেলী মৃদু হেসে বলল -'' সে ঠিক আছে, কিন্তু তোর এই খুশির খবরটা সকলকে জানিয়েছিস তো?''
পারমিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল -'' হ্যাঁ সক্কলকে জানিয়েছি।''
'' আচ্ছা তাহলে আজকে আসি রে, আমাকে আবার একবার পিসিমার বাড়ি যেতে হবে।''- বলে কুহেলী চলে গেলো।
পারমিতা তার রোগী দেখা শেষ করে যখন রাস্তায় এসে দাঁড়ালো তখন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট গুলোতে মৃদু আলো জ্বলতে শুরু করেছে। বাসটা আসতে এখনো কিছুটা সময় আছে। পারমিতা একাই দাঁড়িয়ে ছিলো। কিছুক্ষণ পরে সেখানে দুজন ছেলেমেয়ে এসে দাঁড়ালো। তাদের বয়স আঠারো - উনিশের কাছাকাছি। দেখেই বোঝা যায় তারা পরস্পরের মনের আদান - প্রদান ও অভিলিপ্সা ব্যক্ত করতে ব্যস্ত। দূরে কোনও এক জায়গা থেকে রবি ঠাকুরের গান ভেসে আসছিলো। পারমিতা ও গুনগুন করে সেই গানের সঙ্গে সুর মেলালো - '' আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে....''
বাস এসে গেলো, পারমিতার সাথে সাথে সেই ছেলেমেয়েটিও উঠে পড়ল বাসে।
দিনের বেলায় হাসপাতাল আর রাতে বাড়ি এভাবেই চলছিল। এরপর একদিন পারমিতার বাবা সুপাত্রের সন্ধান করে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলল। রাত্রিতে খাবার টেবিলে বসে ওর বাবা ওকে বলল -'' দেখ মা, তোর বিয়ের জন্য একটা ভালো ছেলে দেখেছি। খুব ভালো ছেলে, দেখতেও বেশ ভালো, খুব বড় ব্যাবসায়ী। তোর পছন্দ হবে তো।''
পারমিতা বলল -'' পছন্দ - অপছন্দের কি আছে বাবা। তোমরা যখন ঠিক করেছ তাতেই হবে।''
বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেলো। ছেলে ব্যাবসায়ী, আদি নিবাস দুর্গাপুর। এক শুভ দিনে মহাআয়োজনের সাথে পারমিতার বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেলো।
বেশ সুখেই কাটছিল তার বৈবাহিক জীবন, সেই সঙ্গে তার কর্মজীবন ও। তাদের বিবাহিত জীবনের একবছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। রাতে খাবার টেবিলে বসে রণিত পারমিতাকে বলল -'' আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী, বলো তুমি কি গিফট নিতে চাও।''
পারমিতা একটু চুপ করে থেকে বলল -'' আমার কোনো গিফট চাই না, কিন্তু একটা কথা বলব শুনবে?''
"হ্যাঁ, বলো কি কথা?" রনিত বলল।
"আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল যে আমি ডাক্তারিটা পেয়ে গেলে দুঃস্থ মানুষদের, যারা দুবেলা ঠিকমতো খাবার পায় না, যারা একমুঠো খাবারের জন্য কঠোর সংগ্রাম করে, তাদের মুখে আমি কিছু খাবার তুলে দেব। তুমি কি সাহায্য করবে আমাকে?" বলল পারমিতা।
"এতো খুব ভালো কথা। তুমি চেয়েছো মানুষের সেবা করতে, আর তাতে আমি তোমাকে সাহায্য না করে পারি। অবশ্যই আমি তোমার সাথে থাকবো।" আশ্বাস দিল রনিত।
নির্দিষ্ট দিনে এলাকার একটি সেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত আয়োজন করে ফেলল ওরা। একটি শিব মন্দির সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় সকলকে লাইন করে বসতে দেওয়া হয়েছে। পারমিতা বলল সে নিজে হাতে খাবার পরিবেশন করবে সকলকে। আজ পারমিতাকে বেশ হাসিখুশি ও উচ্ছসিত দেখাচ্ছিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিল রনিত। পারমিতাকে সবসময় এরকমই হাসিখুশি দেখতে চাই সে।
সকলকে পরিবেশন করতে করতে একেবারে শেষ প্রান্তে বসে থাকা একটি পাগল গোছের লোকের কাছে এসে পারমিতার হাত থেমে গেল, তার বুকটা কেঁপে উঠল। পাগল গোছের লোকটা তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে, আর তার রুক্ষ চুলের ফাঁক দিয়ে কপালের মাঝ বরাবর একটি চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এই চিহ্নটা পারমিতার খুব পরিচিত। লোকটির কপালে একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি কাটা চিহ্ন রয়েছে। পারমিতা সেদিকে তাকিয়ে থেকেই সংস্থার চেয়ারম্যানকে ডেকে লোকটির পরিচয় জানতে চাইলো।
চেয়ারম্যান পরেশ সামন্ত যা বললেন তা হলো - "চার - পাঁচ বছর আগে ইস্পাত কারখানার একদল শ্রমিক লোকটিকে রেললাইনের ধারে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে খবর দেয়। তখন সংস্থার লোকজন গিয়ে লোকটিকে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করে। ডাক্তার বলেন যে অ্যাক্সিডেন্ট এ ব্রেইন হ্যামারেজের কারণে ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তারপর থেকে ও এই এলাকাতেই থাকে, এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়, কিছু দিলে খায় আবার অনেক সময় খায়ও না। কেউ কিছু বললে তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
পারমিতা কথাগুলো শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। পরেশবাবু বললেন, " ম্যাডাম আপনি ওসব বাদ দিন তো, এরকম লোক আপনি সমস্ত শহরে অনেক দেখতে পাবেন। সকলের খাওয়া হয়ে গিয়েছে, চলুন এবার আপনি কিছু খেয়ে নিন।"
পারমিতা বলল -"আপনি যান, আমি আসছি।"
পারমিতা পাগলটির দিকে তাকিয়ে দেখল, সে একমনে খেয়ে চলেছে। আর তার চুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সেই কাটা চিহ্ন।
পারমিতার চোখের সামনে ভেসে উঠল আট বছর আগের একটি মুহূর্ত - পারমিতা তখন মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। একদিন সন্ধায় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে সে। রাস্তাতে লোকজনও তেমন নেই। জায়গাটা নির্জন। তারই মাঝে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও সেদিন কোনো বাস এলো না। পারমিতার ভয়ও করছে। হটাৎ রাস্তায় একটি লাইট এগিয়ে আসতে দেখা গেলো। একটি বাইক এগিয়ে আসছে তার দিকে। বাইকটি এসে থামল তার সামনে। বাইক এ বছর পঁচিশের একটি ছেলে বসে আছে। ওর ভয় আরও বেড়ে গেল। ছেলেটির যদি কোনো কুমতলব থাকে।
ছেলেটা বাইক থেকে নেমে এগিয়ে এল পারমিতার দিকে। পারমিতা শক্ত করে ধরেছে ছাতার হাতলটা। কিছু না হোক, ছাতা দিয়ে আঘাত তো করতে পারবে।
পারমিতা সাহায্যের জন্য চিৎকার করবে কি না ভাবছে, এমন সময় ছেলেটা বলল, " ভয় নেই ম্যাডাম, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করবো না। আপনাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, দেখে মনে হলো আপনি ভদ্র ঘরের মেয়ে, তাই দাঁড়ালাম। বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন বুঝি!"
পারমিতা মৃদু স্বরে উত্তর দিল, "হ্যাঁ।"
ছেলেটি বলল, "আজকে আর কোনো বাস পাবেন না। বাস ইউনিয়ন কি একটা ঝামেলার কারণে সব বাস বন্ধ রেখেছে। আপনি যাবেন কোথায়?"
পারমিতা মনে কিছুটা সাহস সঞ্চার করে বলল, "মেডিকেল কলেজ হোস্টেল।"
ছেলেটি বলল, "আরে বাহ্! আমিও তো ওদিকেই যাব। চলুন আপনাকে পৌঁছে দিই।"
পারমিতা বলল, '' না না, আমি একাই চলে যেতে পারব।''
ছেলেটি বলল, '' এখান থেকে হোস্টেল অনেকটা রাস্তা। আর এই জায়গাটাও খুব একটা ভালো না। তাছাড়া আমার বাড়ি কলেজের কাছেই, ইন্দ্রপ্রস্থে। নির্ভয়ে চলে আসুন।''
পারমিতা ভাবল ছেলেটি যেভাবে কথা বলছে তাতে খারাপ কিছু মনে হচ্ছে না। আর রাতও হয়েছে। কুহেলী দুবার ফোন করেছিল। ও নিশ্চয় চিন্তা করবে। বাস ও এখন পাওয়া যাবে না। তার থেকে ছেলেটার সাথে যাওয়ায় ভালো। তাই সে বলল, ''ঠিক আছে চলুন।''
ছেলেটি বাইকে স্টার্ট দিল। এই প্রথম কোনো অচেনা ছেলের বাইকে বসলো সে, তাই পারমিতা গিয়ে একটু দূরত্ব বজায় রেখে সিটে বসল।
বাইক চালাতে চালাতে ছেলেটি বলল, ''আচ্ছা ম্যাডাম আপনার নামটাই তো জানা হলো না।"
পারমিতা সংক্ষেপে বলল, "পারমিতা স্যান্যাল।"
ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল, "আপনাকে দেখে তো এই এলাকার মনে হয় না। বাড়ি কোথায়?"
পারমিতা এতক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। সে এতক্ষণ আড়ষ্ট ভাবে বসেছিল। এবার একটু স্বাভাবিক ভাবে বসে ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বলল, "আমার বাড়ি বোলপুর, এখানে মেডিকেলের হোস্টেলে থাকি।"
ছেলেটি বলল, "কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন! আমিও তো বোলপুর থেকেই আসছি। বোলপুরে আমার পিসির বাড়ি।"
"তাই! তো বোলপুরের কোথায় আপনার পিসির বাড়ি?" পারমিতা জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটি বলল, "ওই যে আদিত্যপুর, কোপাই নদীর কাছেই। আর আপনার বাড়িটা?"
পারমিতা ছোট্ট করে উত্তর দিল, "রবীন্দ্র বীথি বাইপাস।"
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, "আপনার বাড়িতে কে কে আছে?"
পারমিতা বলল, "আমি, বাবা আর আমার ঠাকুমা, মানে বাবার এক পিসি।"
"আর আপনার মা?"
"মা, মা নেই। আমার যখন আট বছর বয়স তখন মা এক জটিল অসুখে মারা যান।" কথাগুলো বলতে বলতে পারমিতার চোখে জল চলে এলো।
ছেলেটি আর কোনো কথা বলল না। অতঃপর তারা এসে পৌঁছল হোস্টেলের গেটের সামনে। বাইক থেকে নেমে পারমিতা ছেলেটিকে বলল, "আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, আপনি আমার আজ অনেক উপকার করলেন।"
"ধন্যবাদ বলে ছোটো করবেন না ম্যাডাম। এটা তো মানুষ হিসেবে আমার কর্তব্য ছিলো আপনাকে সাহায্য করা। ওকে ম্যাডাম আজ আসি। হয়তো আবার কোনোদিন দেখা হবে বা হয়তো হবে না।" বলে ছেলেটি চলে গেলো।
পারমিতা রুমে গিয়ে দেখলো কুহেলী বায়োকেমিস্ট্রি থেকে বায়োলজিকাল অক্সিডেশন খুলে হাই - এনার্জি কম্পাউন্ড মুখস্ত করছে।
পারমিতা ঘরে ঢোকাতে কুহেলী মুখ তুলে বলল, "কি রে! এতো দেরী হলো তোর? আমি কখন থেকে তোর জন্য চিন্তা করছি।"
পারমিতা বলল, "আর বলিস না, বাসস্ট্যান্ড এ দাঁড়িয়ে আছি, একটাও বাস নেই। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা ছেলে বাইক নিয়ে আসছিল, তার বাইকেই এলাম।"
"তুই চেনা নেই, জানা নেই, অচেনা একটা ছেলের বাইকে চলে এলি। তাও আবার এই রাতের বেলা। কাকু যদি জানতে পারে কি হবে ভেবেছিস?"
"আরে নারে! তুই আর বাবার মতো শাসন শুরু করিস না। আমি তো প্রথমে আসতে চাইনি। আমারও ভয় ভয় করছিল। কিন্তু ছেলেটার কথা শুনে বুঝলাম ছেলেটা ভালোই। আর তাছাড়া আমাকে তো হোস্টেলেও ফিরতে হতো।"
"ছেলেটা তোকে এমনি এমনিই এতোটা রাস্তা বাইকে করে দিয়ে গেলো?"
"না, না, ছেলেটার বাড়িও তো বলল এদিকেই কোথায় ইন্দ্রপ্রস্থ না কি!"
"হ্যাঁ ইন্দ্রপ্রস্থ তো আমাদের হোস্টেল থেকে উত্তরে দশ মিনিটের পথ। তাহলে ভালোই করেছিস চলে এসেছিস।"
"কুহেলী চল খুব ক্ষিদে পেয়েছে, খেয়ে আসি।"
"হ্যাঁ চল, আমিও তোর জন্য না খেয়ে বসে আছি।"
বেশ কিছুদিন পর কুহেলী আর পারমিতা দুজনে বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছে। ছুটির দিনগুলিতে বিকেলবেলায় ওদের দুজনের ঘোরার জায়গা হলো কৃষ্ণসায়র পার্ক। খুব সুন্দর পার্কটা। মাঝখানে এক বিশাল পুকুর যার নাম কৃষ্ণসায়র। আর পুকুরের চারিদিকে সুন্দর করে সাজানো পার্কটা। ওই পার্ক এরই এক কোণে গিয়ে ওরা বসল।
কিছুক্ষণ পরে কয়েকটা ছেলে এসে ওদের পাশের ঝোপটার কাছে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে শুরু করলো। তাদেরই মধ্যে একজন একটা সিগারেট খাচ্ছিল। সিগারেটের ধোঁয়া আর গন্ধ পৌঁছে যাচ্ছিল পারমিতাদের কাছ পর্যন্ত। পারমিতা তাই ছেলেটাকে বারণ করার জন্য উঠে গেল। ছেলেটিকে ডাকাতে ছেলেটি ঘুরে তাকাতেই পারমিতা দেখল এতো সেই ছেলেটি, যে কিছুদিন আগে তাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিয়েছিল।
পারমিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনি?"
ছেলেটিও পারমিতার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বলল, "আরে ম্যাডাম, আপনি এখানে?"
পারমিতা একটু ধমকের সুরেই বলল, "আগে সিগারেটটা ফেলুন, তারপর কথা বলব।"
ছেলেটির এতক্ষণ মাথাতেই ছিল না যে তার হাতে সিগারেট রয়েছে। সে হাতের দিকে তাকিয়ে সিগারেটটা তাড়াতাড়ি ফেলে দিয়ে বলল, "ওহ্ হ্যাঁ অবশ্যই, এই যে ফেলে দিয়েছি।"
পারমিতা বলল, "আপনি এখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন তাতে পাশে যারা আছে তাদের যে অসুবিধা হতে পারে সে খেয়াল আছে?"
ছেলেটি আলতো আলতো ভাবে বলল, "ওই ম্যাডাম বন্ধুদের সাথে একটু আধটু!"
পারমিতা এবার নরম সুরে বলল, "আচ্ছা বেশ। আর হ্যাঁ তখন থেকে কি আপনি আমাকে ম্যাডাম-ম্যাডাম করে যাচ্ছেন বলুন তো।"
ছেলেটি বলল, "না, আসলে আপনি ভদ্র ঘরের মেয়ে। ডাক্তারি পড়ছেন। কিছুদিন পর ডাক্তার হবেন। তাছাড়া মেয়েদের সম্মান জানিয়ে ম্যাডাম বলতে ক্ষতি কি বলুন।"
পারমিতা বলল, "আচ্ছা, হয়েছে। কিন্তু আপনি আমাকে আর ম্যাডাম বলবেন না। কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, সেদিন রাতে আপনি আমার উপকার করলেন, আবার আজ আপনার সাথে দেখা হয়ে গেলো।"
ছেলেটি বলল, "আমি তো বলেই ছিলাম ভাগ্যে থাকলে আবারও দেখা হতে পারে।"
পারমিতা বলল, "দেখেছেন, দুবার আপনার সাথে দেখা হলো কিন্তু আপনার নামটা জানা হলো না।"
ছেলেটি বলল, "এটি আমারও মিসটেক ছিল। আমার উচিত ছিল আপনার নামটা জানার পর আমার নামটাও আপনাকে জানানো। আমার নাম নীলাদ্রি জানা।"
পারমিতা বলল, "আচ্ছা নীলাদ্রি আসুন, আমি আপনার সাথে আমার বান্ধবীর পরিচয় করিয়ে দিই।"
কুহেলীর কাছে গিয়ে পারমিতা বলল, "কুহেলী এ হচ্ছে নীলাদ্রি, সেদিন রাতে উনিই আমাকে হোস্টেল পৌঁছে দিয়েছিলেন। আর নীলাদ্রি ও হচ্ছে কুহেলী, হোস্টেলে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।"
তিনজন একসাথে বসে গল্পঃ করতে লাগলো। পার্কের একটা ল্যাম্পপোস্টের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নীলাদ্রির মুখে এসে পড়ছিল। সেই আলোতে পারমিতা লক্ষ্য করলো নীলাদ্রির কপালে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি দাগ রয়েছে। সেটা দেখিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, "নীলাদ্রি তোমার কপালে এটা কিসের দাগ, কেটে গেছিলো নাকি?"
নীলাদ্রি বলল, "এটা কিসের দাগ জানিনা, কিন্তু মা বলে জন্মের সময় থেকেই আছে।"
কুহেলী মজা করে বলল, "তুমি হারিয়ে গেলেও কিন্তু তোমার ঐ দাগটা দেখে খুব সহজেই তোমাকে চেনা যাবে।"
নীলাদ্রিও পাল্টা মজা করে বলল, "সেই জন্যই হয়তো ভগবান সহজে আমাকে খোঁজার জন্য এই দাগটা করে দিয়েছে।"
কিছুক্ষণ গল্পঃ করার পর পারমিতা বলল, "নীলাদ্রি এবার আমাদের যেতে হবে, নইলে হোস্টেলে লেট হয়ে যাবে।"
নীলাদ্রি বলল, "আচ্ছা, চলুন আমি আপনাদের এগিয়ে দিই।"
পারমিতা বলল, "না-না, তার দরকার নেই। আমরা চলে যাবো, ওকে বাই।"
পারমিতারা চলে আসলে নীলাদ্রি সেদিকেই চেয়ে রইলো যতক্ষণ ওদের দেখা যায়।
এরপর দিন যেতে লাগলো। প্রতি ছুটির দিনেই পারমিতা ও নীলাদ্রি কে দেখা যেত একসাথে পার্কে বসে গল্পঃ করতে। ধীরে ধীরে ওদের আপনি সম্বোধন এসে পৌঁছল তুমিতে। সময় অতিবাহিত হয়ে চলেছে আপন গতিতে। শীত শেষে গাছে গাছে পাতা ঝরে গিয়ে জানান দিচ্ছে বসন্ত এসে গেছে। নতুন নতুন ফুলে ভরে যেতে শুরু করেছে সমস্ত শাখা-প্রশাখা। মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নতুনের আনন্দ। এমনই এক সন্ধ্যায় পারমিতা আর নীলাদ্রি বসে আছে কৃষ্ণসায়রের জলে পা ভিজিয়ে। হঠাৎ নীলাদ্রি পারমিতাকে বলল, "তুমি একটু বসো, আমি এক্ষুনি আসছি।"
নীলাদ্রি চলে গেলে পারমিতা আর কুহেলী গিয়ে দাঁড়ালো পার্কের ওরা যেখানে বসে ছিল তারই পিছনে একটি জাপানি ম্যাপল গাছের পাশে। ম্যাপল গাছটায় নতুন পাতা আসতে শুরু করেছে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে গাছটিকে। নীলাদ্রি ফিরে এসে দেখল ওরা দুজন দাঁড়িয়ে আছে।
নীলাদ্রি পারমিতার সামনে এসে হাতে একগোছা লাল পলাশের সাথে লাল গোলাপ নিয়ে নতজানু হয়ে বসে পারমিতার প্রতি প্রেমপূর্ণ কণ্ঠে বলল, "পারমিতা সেই রাতের আলো আঁধারিতে তোমাকে দেখেছিলাম। তারপর তোমার সাথে চলতে চলতে জানিনা কবে আমার মনের খাতায় তোমার ছবি অঙ্কিত হয়ে গেছে। তোমাকে দেখে বুঝেছি ভালোবাসার অনুভূতি। তুমি কি হবে আমার বসন্তের পলাশ, রাঙিয়ে দেবে আমার জীবনটাকে তোমার লাল আভায়, পথ চলবে আমার সাথে চিরকাল!"
পারমিতা একভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে কোনদিকে তাকাতে পারছে না। এগুলো কি ও স্বপ্ন দেখছে। ও শুনতে পাচ্ছে পাশ থেকে নীলাদ্রির বন্ধুরা বলে চলেছে ' ইয়েস পারমিতা অ্যাকসেপ্ট হিম।' কুহেলী বলছে, "হ্যাঁ বলে দে।"
পারমিতা কি করবে বুঝতে পারছে না। লজ্জায় ওর গাল দুটো ঠিক লাল পলাশের মতোই লাল হয়ে গিয়েছে। কেউ কোনোদিন এভাবে ওকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়নি। কিন্তু সে নিজেও তো ভালোবাসতে শুরু করেছিল নীলাদ্রিকে। প্রকাশ করতে পারেনি কোনোদিন। আজ যখন নীলাদ্রি নিজে তার কাছে ভালোবাসার প্রস্তাব রেখেছে তখন সে কেনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এসব ভাবতে ভাবতে সে যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। নীলাদ্রির কথাতে তার ভাব কাটলো - "তুমি কি হবে আমার বসন্তের রানী!"
পারমিতা কোনো কথা না বলে নীলাদ্রির হাত থেকে পলাশ আর গোলাপগুলো নিয়ে কুহেলীর হাত ধরে লজ্জায় লাল হয়ে ছুটে বেরিয়ে এলো পার্ক থেকে। হোস্টেলে ফিরে সেই রাতে আর ঘুমাতে পারলো না সে। দুচোখের পাতায় শুধু নীলাদ্রির ভালোবাসার প্রস্তাবই জায়গা করে নিল।
এরপর বেশ আনন্দেই কাটছিল ওদের দিনগুলো। একদিন পারমিতার বাবা জানতে পারলেন ওদের সম্পর্কের কথা। তিনি পারমিতাকে ডেকে বললেন নীলাদ্রিকে একদিন নিয়ে আসতে ওদের বাড়ি। তিনি কথা বলতে চান তার সাথে। সেইমতো পারমিতা একদিন নিয়ে গেল নীলাদ্রিকে তাদের বাড়িতে।
পারমিতা নীলাদ্রিকে গেস্টরুমে বসতে দিয়ে চা করার জন্য চলে গেল। নীলাদ্রি টেবিল থেকে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে পড়ছিল। কিছুক্ষণ পরে পারমিতার বাবা ঘরে ঢুকলে নীলাদ্রি সম্মান পূর্বক নমস্কার জানিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
পারমিতার বাবা নীলাদ্রিকে ইশারাতে বসতে বলে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, "নাম কী তোমার?"
নীলাদ্রি নাম জানানোর সাথে সাথেই চলে এলো দ্বিতীয় প্রশ্ন, "বাড়ি কোথায়?"
নীলাদ্রি বলল, "ইন্দ্রপ্রস্থ, বর্ধমান।"
"বাড়িতে কে কে আছে?"
"বাবা-মা আর আমি।"
"কী করা হয়?"
"আমি এখন টিউশন পড়ায় আর চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।"
"তার মানে বেকার।"
নীলাদ্রি কোনো কথা না বলে চুপ করে রইলো।
"পারমিতাকে কতদিন ধরে চেনো?"
"তিন বছর থেকে।"
"শোনো তোমাকে কিছু কথা বলি। ছোটো থেকেই পারমিতাকে আমি খুব যত্ন করে বড় করেছি। ওর কোনোকিছুর অভাব হতে দিই নি। আমার মেয়েকে আমি সেই শিক্ষায় দিয়েছি যে সে আমার কথার অবাধ্য হবে না। আর কিছুদিন পরেই ও ডক্টর হয়ে যাবে। ও হাই-প্রোফাইল লোকেদের সাথে চলাফেরা করবে। তোমার কী যোগ্যতা আছে আমার মেয়ের সাথে বিয়ে করার। আমরা ব্রাহ্মণ, আর তোমরা....? আর হ্যাঁ আমি পারমিতার বিয়ের জন্য উচুঁ ঘরের ছেলে ঠিক করেছি। ওর বিয়ে সেখানেই হবে। আর সেই ছেলেকেও পারমিতার পছন্দ। তাই আজকের পর থেকে আমার মেয়ের কথা ভুলে যাও। আর এরপর দ্বিতীয়বারের জন্য যদি আমার মেয়ের সাথে সম্পর্কের কথা শুনি তাহলে আমি অন্য স্টেপ নিতে বাধ্য হবো।"
নীলাদ্রি এতক্ষণ মাথা নিচু করে সব শুনছিল। এবার সে বলল, "দেখুন আমি আপনার মেয়েকে ভুলে যাবার জন্য ভালোবাসিনি। আর সেটা আপনার কথাতে হবে সেটাও নয়। আমি যেমন তাকে ভালবাসি সেও আমাকে ভালোবাসে। তাই আমি শুধু তার কথাটাই শুনতে চাই।" কথাগুলো বলে নীলাদ্রি আর দাঁড়ালো না সেখানে।
নীলাদ্রি চলে যাওয়ার পরে পরেই পারমিতা চা, মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকে নীলাদ্রিকে দেখতে না পেয়ে ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "বাবা নীলাদ্রি কোথায় গেলো?"
ওর বাবা বলল, "চলে গিয়েছে। অবশ্য চলে গিয়ে ভালোই হয়েছে। দেখ মা, ছেলেটা সুবিধার নয়। ও শুধু তোকে ভালোবেসেছিল টাকার লোভে, তুই বড় ডাক্তার হয়ে অনেক টাকা ইনকাম করবি সেই জন্য। আর ছেলেটার সাথে কথা বলে জানলাম ওর নাকি আরো অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। তোকে ও মন থেকে ভালবাসে নি। ও তোকে শুধু আমাদের সম্পত্তির লোভে ভালো বেসেছে। আমি ওকে বললাম তুই বড় ডাক্তার হোবি, কত নাম করবি, কত বড় বড় লোকের সাথে চলবি। তাহলে ওকেও তো তোর পাশে থাকতে হবে। ওকেও তো ভালো কিছু করতে হবে। কিন্তু ও কি বলল জানিস, বলল তুই ডাক্তার হয়ে ইনকাম করবি সেটাই নাকি সে চাই, আর সে কিছু করবে না। ও শুধু তোর টাকাকেই ভালোবাসে। তুই ভাব ও আমাকে অপমান করে গেলো। আমার সামনে তোকে অপমান করল। তুই ভুলে যা ওই ছেলেকে। ওসব ছোটো ঘরের ছেলেগুলো ওরকমই হয়। তাই আমি চাই না তুই আর ওর কথা মনে রাখিস। আমি তোর জন্য অনেক ভালো একটা ছেলে দেখেছি, তার সাথে তোর বিয়ে দেবো।"
সেদিন রাতে পারমিতা ঘুমাতে পারলো না। ওর গাল দুটো ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। ফোনটা নিয়ে কল করল নীলাদ্রিকে। ফোন বেজে চলেছে কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। অনেক ফোন করেও সে রাতে আর নীলাদ্রি ফোন ধরলো না। পারমিতা কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না।
পরদিন সকালে হোস্টেল যাবে বলে ও রেডি হচ্ছিল। কিন্তু ওর বাবা বলল, "এখন কদিন তোকে কলেজ যেতে হবে না, আমি প্রিন্সিপাল এর সাথে কথা বলে নেব। আর ওই ছেলেকে তুই ভুলে যা। আমি চাই না তুই আর ওই খারাপ ছেলের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখ। তুই তো জানিস আমি যা করব তা তোর ভালোর জন্যই করব। তুই কি চাস বল আমাকে ছেড়ে ওই খারাপ ছেলেটার সাথে সম্পর্ক রাখতে।"
পারমিতা কোনো কথা বলতে পারল না। ওর দুচোখ বেয়ে শুধু জল ঝড়ে পড়ল।
এরপর এক সপ্তাহ দুজনের মধ্যে কোনো যোগাযোগ রইলো না। কিছুদিন পর কলেজের একটা দরকারে পারমিতা হোস্টেলে গেল। সেদিন বিকেলে হটাৎ নীলাদ্রির ফোন এলো পারমিতার কাছে। নীলাদ্রি ফোনে বলল পার্কে দেখা করতে কিছু কথা আছে।
প্রায় সন্ধ্যার আগে পারমিতা পার্কে গিয়ে দেখল নীলাদ্রি একটা গাছের নীচে ঘাসের ওপর বসে আছে।
পারমিতা কাছে গিয়ে বলল, "বলো কি বলবে বলছিলে?"
নীলাদ্রি পারমিতাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "পারমিতা তোমার বাবা তোমাকে কী বলেছে জানি না, কিন্তু তুমি কি আমাকে খারাপ মনে করো। তুমি কি মনে করো আমি তোমার অযোগ্য?"
পারমিতা বলল, "তুমি আমার যোগ্য নাকি অযোগ্য সেগুলো আমি কোনোদিনও ভাবিনি। আমি শুধু তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু তুমি, তুমি আমাকে মন থেকে ভালোবাসো নি। তুমি আমাকে অপমান করেছ, আমার বাবাকে অপমান করেছ। তাই আমি ঠিক করে নিয়েছি বাবা যে ছেলেকে পছন্দ করে দেবে তাকেই বিয়ে করব।"
নীলাদ্রি পারমিতার হাতটা ধরে বলল, "তাহলে আমাদের ভালোবাসার কি হবে?"
পারমিতা বলল, "সেটা তোমার আগে বোঝা উচিত ছিল। আমি সেদিন রাতে খুব কষ্টের মধ্যে ছিলাম। অনেকবার ফোন করেছি তোমাকে, কিন্তু তুমি তার কোনো উত্তর দাওনি। আজ এক সপ্তাহ তুমি কোনো খবর পর্যন্ত নাওনি।"
"দেখো পারমিতা সেদিন তোমার বাবা আমাকে যে কথাগুলো বলেছিলেন তাতে আমার মাথার ঠিক ছিল না। তাই হয়তো তোমার ফোন ধরতে পারিনি। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলে যাবো এটা কোনোদিনও ভাবিনি।" নীলাদ্রি পারমিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করল।
"সত্যি কথা তো এটাই তুমি আমাকে কখনো ভালোইবাসোনি, তুমি আমাকে ব্যাবহার করতে চেয়েছ।"
"এটা তুমি কি বলছ পারমিতা, আমি তোমাকে ব্যাবহার করতে চেয়েছি? তুমি এমনটা ভাবতে পারলে?"
"নীলাদ্রি তুমি আমাকে ভুলে যাও। আমি পারবো না আর তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে।"
"পারমিতা আমরা যে এতো সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়েছি সেই স্মৃতিগুলোর কি হবে? আমাদের সম্পর্কের কি হবে? আমাদের স্বপ্ন গুলোর কি হবে? তার কি কোনো মূল্য নেই?"
"আমাকে ক্ষমা করে দিও, আর আজ থেকে পারমিতা নামটা ভুলে যেও।" কথাটা বলে পার্ক থেকে চলে এলো পারমিতা। সেই রাতে সে খুব কেঁদেছিল। সত্যিই কি কোনোদিন সে ভুলতে পারবে নীলাদ্রিকে। এরপর নীলাদ্রির আর কোনো খোঁজ পায়নি সে। তারপর সে ডক্টর হলো, বাবার দেখা ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে গেল তার। আর অপর দিকে পারমিতার বিয়ের বছর দুয়েক আগে নীলাদ্রি এসেছিল দুর্গাপুরে কাজের সন্ধানে।
পুরোনো দিনের সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠলো পারমিতার। চোখের সামনেটা আবছায়া থেকে অন্ধকার হয়ে উঠলো। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখল সে একটা নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে আছে। তাকে উঠে বসতে দেখে রনিত এগিয়ে এসে বলল, "এখন কেমন বুঝছো।"
পারমিতা বলল, "ভালো। রনিত ওই লোকটা কোথায়?"
পাশেই পরেশবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি বললেন, "ম্যাডাম আপনি ওতো চিন্তা করবেন না। সে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়, আছে কোথাও।"
পারমিতা বলল, "ও যেখানে থাকে সেখানে আমাকে একবার নিয়ে যাবেন?"
পরেশবাবু বললেন, "কিন্তু ম্যাডাম আপনি ওখানে গিয়ে কি করবেন?"
পারমিতা বলল, "আমার দরকার আছে, আপনি আমাকে নিয়ে চলুন।"
রনিত বলল, "পারমিতা তোমার শরীরের অবস্থা ভালো নয়।"
পারমিতা অনুনয়ের সুরে বলল, "আমি ভালো আছি রনিত, প্লিজ আমাকে একবার নিয়ে চলো।"
অতঃপর ওরা শহরের একপাশে একটি বিশাল বটগাছের কাছে গিয়ে পৌঁছলো। গাছের নীচে বটের ঝুড়ির ফাঁকে কিছু কাপড় দিয়ে একটি ঝুপড়ির মতো করা।
পরেশবাবু একজন লোককে বললেন, "দেখো তো ভিতরে গিয়ে লোকটা আছে নাকি।"
লোকটি ফিরে এসে বলল, "না স্যার সেই পাগলটা তো নেই, তার কোনো জিনিস ও নেই। তবে এই কাগজটা পরে ছিল।
পারমিতা লোকটির হাত থেকে কাগজটা নিয়ে দেখল তাতে কিছু লাইন লেখা রয়েছে। পড়তে পড়তে পারমিতার চোখে জল চলে এলো -
"হেরিছ যারে সবার মাঝে
চেয়েছো যারে চিরকালে;
যদি তারে করো হৃদয়ের প্রেম
দেখা হবে তবে মনের অন্তরালে।।"
লেখক - অরিন্দম বিশ্বাস