শুক্রবার, ১৭ মার্চ, ২০২৩

অন্তরালে

      ছোট্ট থেকেই ডাক্তার হয়ে দুঃস্থ লোকেদের সেবা করাই ছিল পারমিতার স্বপ্ন। তাই হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেই প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলো ডাক্তারি পরীক্ষার। পারমিতার বাবা স্কুলের শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তিনি যেমন নিষ্ঠাবান, তেমনই মেয়ের প্রতিও তার রয়েছে অগাধ স্নেহ।

  মেয়ে বাইরে গিয়ে একা থাকতে পারবে কি না, বাইরের সবকিছু মানিয়ে চলতে পারবে কি না, বাইরে গিয়ে কোনো খারাপ প্রভাব তার উপর পরবে না তো, এইসব নানা চিন্তা - দুশ্চিন্তা কাটিয়ে অবশেষে পারমিতা মেডিকেল কলেজের ছাড়পত্র পেয়েই গেলো।

 বীরভূমের একটি মফস্বল থেকে আগামী কয়েক বছরের জন্য পারমিতার ঠিকানা হলো বর্ধমান মেডিকেল কলেজের ছাত্রী আবাস। না, যতটা চিন্তা বাবা করছিল ততটা চিন্তার কোনো কারণ নেই। এক সপ্তাহ হোস্টেলে থাকার পর ভাবলো পারমিতা। পারমিতার সঙ্গেই অনেক জায়গা থেকেই অনেক মেয়ে এসেছে হোস্টেলে। তাদের অনেকের সাথেই খুব ভালো বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছে তার। তাদের মধ্যে একজন হলো কুহেলী, হোস্টেলে পারমিতার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

 মেডিকেল কলেজে শিক্ষাজীবন শেষ করে পারমিতা তার কর্মজীবন শুরু করলো বোলপুরের একটি গ্রামীণ হাসপাতালে। বোলপুর জায়গাটা তার বরাবরই পছন্দের, আর সেখানেই কর্মজীবন শুরু করতে পেরে সে খুব খুশি। আজ তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ছোট থেকেই যে স্বপ্ন সে দেখতো আজ তা বাস্তব রূপে তার কাছে ধরা দিয়েছে। পারমিতা তার বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে পেরেছে।

 ডাক্তার হিসেবে বোলপুর গ্রামীণ হাসপাতালে আজ তার প্রথম দিন। ডাক্তারি চেয়ারটাতে বসেই সে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু একটা ভাবছিল। হঠাৎ দরজার বাইরে থেকে তার নামটা শুনে সেদিকে তাকালো, দেখলো কুহেলী এসেছে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে।

 '' আরে কুহেলী তুই! আয় আয় ভিতরে আয়,'' উচ্ছসিত হয়ে বললো পারমিতা।

 ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে কুহেলী বলল - '' বল কেমন আছিস? তুই তো এবার ডাক্তার হয়েই গেলি, তোকে তোর ডাক্তারি জীবনে অনেক অনেক অভিনন্দন।'' 

পারমিতা হেসে বলল - '' হ্যাঁ আমি তো ডাক্তার হয়ে গেলাম। আর তুই, তুই কবে জইন করছিস?'' 

 কুহেলী বলল - '' এই তো অপেক্ষা চলছে, জইনিং লেটার পেয়ে গেলেই জইন করবো।'' 

 পারমিতা বলল - '' হ্যাঁ জইন করে নে, তারপর তোর নামের পাশেও লেখা থাকবে ডক্টর কুহেলী।'' 

 কুহেলী মৃদু হেসে বলল -'' সে ঠিক আছে, কিন্তু তোর এই খুশির খবরটা সকলকে জানিয়েছিস তো?'' 

পারমিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল -'' হ্যাঁ সক্কলকে জানিয়েছি।'' 

 '' আচ্ছা তাহলে আজকে আসি রে, আমাকে আবার একবার পিসিমার বাড়ি যেতে হবে।''- বলে কুহেলী চলে গেলো।

 পারমিতা তার রোগী দেখা শেষ করে যখন রাস্তায় এসে দাঁড়ালো তখন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট গুলোতে মৃদু আলো জ্বলতে শুরু করেছে। বাসটা আসতে এখনো কিছুটা সময় আছে। পারমিতা একাই দাঁড়িয়ে ছিলো। কিছুক্ষণ পরে সেখানে দুজন ছেলেমেয়ে এসে দাঁড়ালো। তাদের বয়স আঠারো - উনিশের কাছাকাছি। দেখেই বোঝা যায় তারা পরস্পরের মনের আদান - প্রদান ও অভিলিপ্সা ব্যক্ত করতে ব্যস্ত। দূরে কোনও এক জায়গা থেকে রবি ঠাকুরের গান ভেসে আসছিলো। পারমিতা ও গুনগুন করে সেই গানের সঙ্গে সুর মেলালো - '' আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে....'' 

বাস এসে গেলো, পারমিতার সাথে সাথে সেই ছেলেমেয়েটিও উঠে পড়ল বাসে।

  দিনের বেলায় হাসপাতাল আর রাতে বাড়ি এভাবেই চলছিল। এরপর একদিন পারমিতার বাবা সুপাত্রের সন্ধান করে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলল। রাত্রিতে খাবার টেবিলে বসে ওর বাবা ওকে বলল -'' দেখ মা, তোর বিয়ের জন্য একটা ভালো ছেলে দেখেছি। খুব ভালো ছেলে, দেখতেও বেশ ভালো, খুব বড় ব্যাবসায়ী। তোর পছন্দ হবে তো।'' 

পারমিতা বলল -'' পছন্দ - অপছন্দের কি আছে বাবা। তোমরা যখন ঠিক করেছ তাতেই হবে।'' 

 বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেলো। ছেলে ব্যাবসায়ী, আদি নিবাস দুর্গাপুর। এক শুভ দিনে মহাআয়োজনের সাথে পারমিতার বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে গেলো।

 বেশ সুখেই কাটছিল তার বৈবাহিক জীবন, সেই সঙ্গে তার কর্মজীবন ও। তাদের বিবাহিত জীবনের একবছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। রাতে খাবার টেবিলে বসে রণিত পারমিতাকে বলল -'' আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী, বলো তুমি কি গিফট নিতে চাও।'' 

 পারমিতা একটু চুপ করে থেকে বলল -'' আমার কোনো গিফট চাই না, কিন্তু একটা কথা বলব শুনবে?'' 

 "হ্যাঁ, বলো কি কথা?" রনিত বলল।

 "আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল যে আমি ডাক্তারিটা পেয়ে গেলে দুঃস্থ মানুষদের, যারা দুবেলা ঠিকমতো খাবার পায় না, যারা একমুঠো খাবারের জন্য কঠোর সংগ্রাম করে, তাদের মুখে আমি কিছু খাবার তুলে দেব। তুমি কি সাহায্য করবে আমাকে?" বলল পারমিতা।

 "এতো খুব ভালো কথা। তুমি চেয়েছো মানুষের সেবা করতে, আর তাতে আমি তোমাকে সাহায্য না করে পারি। অবশ্যই আমি তোমার সাথে থাকবো।" আশ্বাস দিল রনিত।

  নির্দিষ্ট দিনে এলাকার একটি সেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত আয়োজন করে ফেলল ওরা। একটি শিব মন্দির সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় সকলকে লাইন করে বসতে দেওয়া হয়েছে। পারমিতা বলল সে নিজে হাতে খাবার পরিবেশন করবে সকলকে। আজ পারমিতাকে বেশ হাসিখুশি ও উচ্ছসিত দেখাচ্ছিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিল রনিত। পারমিতাকে সবসময় এরকমই হাসিখুশি দেখতে চাই সে। 

 সকলকে পরিবেশন করতে করতে একেবারে শেষ প্রান্তে বসে থাকা একটি পাগল গোছের লোকের কাছে এসে পারমিতার হাত থেমে গেল, তার বুকটা কেঁপে উঠল। পাগল গোছের লোকটা তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে, আর তার রুক্ষ চুলের ফাঁক দিয়ে কপালের মাঝ বরাবর একটি চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এই চিহ্নটা পারমিতার খুব পরিচিত। লোকটির কপালে একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি কাটা চিহ্ন রয়েছে। পারমিতা সেদিকে তাকিয়ে থেকেই সংস্থার চেয়ারম্যানকে ডেকে লোকটির পরিচয় জানতে চাইলো।

 চেয়ারম্যান পরেশ সামন্ত যা বললেন তা হলো - "চার - পাঁচ বছর আগে ইস্পাত কারখানার একদল শ্রমিক লোকটিকে রেললাইনের ধারে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে খবর দেয়। তখন সংস্থার লোকজন গিয়ে লোকটিকে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করে। ডাক্তার বলেন যে অ্যাক্সিডেন্ট এ ব্রেইন হ্যামারেজের কারণে ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তারপর থেকে ও এই এলাকাতেই থাকে, এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়, কিছু দিলে খায় আবার অনেক সময় খায়ও না। কেউ কিছু বললে তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

 পারমিতা কথাগুলো শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। পরেশবাবু বললেন, " ম্যাডাম আপনি ওসব বাদ দিন তো, এরকম লোক আপনি সমস্ত শহরে অনেক দেখতে পাবেন। সকলের খাওয়া হয়ে গিয়েছে, চলুন এবার আপনি কিছু খেয়ে নিন।"

 পারমিতা বলল -"আপনি যান, আমি আসছি।"

   পারমিতা পাগলটির দিকে তাকিয়ে দেখল, সে একমনে খেয়ে চলেছে। আর তার চুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সেই কাটা চিহ্ন।

 পারমিতার চোখের সামনে ভেসে উঠল আট বছর আগের একটি মুহূর্ত - পারমিতা তখন মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। একদিন সন্ধায় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে সে। রাস্তাতে লোকজনও তেমন নেই। জায়গাটা নির্জন। তারই মাঝে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও সেদিন কোনো বাস এলো না। পারমিতার ভয়ও করছে। হটাৎ রাস্তায় একটি লাইট এগিয়ে আসতে দেখা গেলো। একটি বাইক এগিয়ে আসছে তার দিকে। বাইকটি এসে থামল তার সামনে। বাইক এ বছর পঁচিশের একটি ছেলে বসে আছে। ওর ভয় আরও বেড়ে গেল। ছেলেটির যদি কোনো কুমতলব থাকে।

 ছেলেটা বাইক থেকে নেমে এগিয়ে এল পারমিতার দিকে। পারমিতা শক্ত করে ধরেছে ছাতার হাতলটা। কিছু না হোক, ছাতা দিয়ে আঘাত তো করতে পারবে।

 পারমিতা সাহায্যের জন্য চিৎকার করবে কি না ভাবছে, এমন সময় ছেলেটা বলল, " ভয় নেই ম্যাডাম, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করবো না। আপনাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, দেখে মনে হলো আপনি ভদ্র ঘরের মেয়ে, তাই দাঁড়ালাম। বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন বুঝি!"

 পারমিতা মৃদু স্বরে উত্তর দিল, "হ্যাঁ।"

 ছেলেটি বলল, "আজকে আর কোনো বাস পাবেন না। বাস ইউনিয়ন কি একটা ঝামেলার কারণে সব বাস বন্ধ রেখেছে। আপনি যাবেন কোথায়?"

 পারমিতা মনে কিছুটা সাহস সঞ্চার করে বলল, "মেডিকেল কলেজ হোস্টেল।"

 ছেলেটি বলল, "আরে বাহ্! আমিও তো ওদিকেই যাব। চলুন আপনাকে পৌঁছে দিই।"

 পারমিতা বলল, '' না না, আমি একাই চলে যেতে পারব।''

 ছেলেটি বলল, '' এখান থেকে হোস্টেল অনেকটা রাস্তা। আর এই জায়গাটাও খুব একটা ভালো না। তাছাড়া আমার বাড়ি কলেজের কাছেই, ইন্দ্রপ্রস্থে। নির্ভয়ে চলে আসুন।''

 পারমিতা ভাবল ছেলেটি যেভাবে কথা বলছে তাতে খারাপ কিছু মনে হচ্ছে না। আর রাতও হয়েছে। কুহেলী দুবার ফোন করেছিল। ও নিশ্চয় চিন্তা করবে। বাস ও এখন পাওয়া যাবে না। তার থেকে ছেলেটার সাথে যাওয়ায় ভালো। তাই সে বলল, ''ঠিক আছে চলুন।''

 ছেলেটি বাইকে স্টার্ট দিল। এই প্রথম কোনো অচেনা ছেলের বাইকে বসলো সে, তাই পারমিতা গিয়ে একটু দূরত্ব বজায় রেখে সিটে বসল।

 বাইক চালাতে চালাতে ছেলেটি বলল, ''আচ্ছা ম্যাডাম আপনার নামটাই তো জানা হলো না।"

 পারমিতা সংক্ষেপে বলল, "পারমিতা স্যান্যাল।"

 ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল, "আপনাকে দেখে তো এই এলাকার মনে হয় না। বাড়ি কোথায়?"

 পারমিতা এতক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। সে এতক্ষণ আড়ষ্ট ভাবে বসেছিল। এবার একটু স্বাভাবিক ভাবে বসে ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বলল, "আমার বাড়ি বোলপুর, এখানে মেডিকেলের হোস্টেলে থাকি।"

 ছেলেটি বলল, "কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন! আমিও তো বোলপুর থেকেই আসছি। বোলপুরে আমার পিসির বাড়ি।"

 "তাই! তো বোলপুরের কোথায় আপনার পিসির বাড়ি?" পারমিতা জিজ্ঞেস করল।

 ছেলেটি বলল, "ওই যে আদিত্যপুর, কোপাই নদীর কাছেই। আর আপনার বাড়িটা?"

 পারমিতা ছোট্ট করে উত্তর দিল, "রবীন্দ্র বীথি বাইপাস।"

 ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, "আপনার বাড়িতে কে কে আছে?"

 পারমিতা বলল, "আমি, বাবা আর আমার ঠাকুমা, মানে বাবার এক পিসি।"

 "আর আপনার মা?"

 "মা, মা নেই। আমার যখন আট বছর বয়স তখন মা এক জটিল অসুখে মারা যান।" কথাগুলো বলতে বলতে পারমিতার চোখে জল চলে এলো।

 ছেলেটি আর কোনো কথা বলল না। অতঃপর তারা এসে পৌঁছল হোস্টেলের গেটের সামনে। বাইক থেকে নেমে পারমিতা ছেলেটিকে বলল, "আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, আপনি আমার আজ অনেক উপকার করলেন।"

 "ধন্যবাদ বলে ছোটো করবেন না ম্যাডাম। এটা তো মানুষ হিসেবে আমার কর্তব্য ছিলো আপনাকে সাহায্য করা। ওকে ম্যাডাম আজ আসি। হয়তো আবার কোনোদিন দেখা হবে বা হয়তো হবে না।" বলে ছেলেটি চলে গেলো।

  পারমিতা রুমে গিয়ে দেখলো কুহেলী বায়োকেমিস্ট্রি থেকে বায়োলজিকাল অক্সিডেশন খুলে হাই - এনার্জি কম্পাউন্ড মুখস্ত করছে।

 পারমিতা ঘরে ঢোকাতে কুহেলী মুখ তুলে বলল, "কি রে! এতো দেরী হলো তোর? আমি কখন থেকে তোর জন্য চিন্তা করছি।"

 পারমিতা বলল, "আর বলিস না, বাসস্ট্যান্ড এ দাঁড়িয়ে আছি, একটাও বাস নেই। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা ছেলে বাইক নিয়ে আসছিল, তার বাইকেই এলাম।"

 "তুই চেনা নেই, জানা নেই, অচেনা একটা ছেলের বাইকে চলে এলি। তাও আবার এই রাতের বেলা। কাকু যদি জানতে পারে কি হবে ভেবেছিস?"

 "আরে নারে! তুই আর বাবার মতো শাসন শুরু করিস না। আমি তো প্রথমে আসতে চাইনি। আমারও ভয় ভয় করছিল। কিন্তু ছেলেটার কথা শুনে বুঝলাম ছেলেটা ভালোই। আর তাছাড়া আমাকে তো হোস্টেলেও ফিরতে হতো।"

 "ছেলেটা তোকে এমনি এমনিই এতোটা রাস্তা বাইকে করে দিয়ে গেলো?"

 "না, না, ছেলেটার বাড়িও তো বলল এদিকেই কোথায় ইন্দ্রপ্রস্থ না কি!"

 "হ্যাঁ ইন্দ্রপ্রস্থ তো আমাদের হোস্টেল থেকে উত্তরে দশ মিনিটের পথ। তাহলে ভালোই করেছিস চলে এসেছিস।"

 "কুহেলী চল খুব ক্ষিদে পেয়েছে, খেয়ে আসি।"

 "হ্যাঁ চল, আমিও তোর জন্য না খেয়ে বসে আছি।"

   বেশ কিছুদিন পর কুহেলী আর পারমিতা দুজনে বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছে। ছুটির দিনগুলিতে বিকেলবেলায় ওদের দুজনের ঘোরার জায়গা হলো কৃষ্ণসায়র পার্ক। খুব সুন্দর পার্কটা। মাঝখানে এক বিশাল পুকুর যার নাম কৃষ্ণসায়র। আর পুকুরের চারিদিকে সুন্দর করে সাজানো পার্কটা। ওই পার্ক এরই এক কোণে গিয়ে ওরা বসল।

 কিছুক্ষণ পরে কয়েকটা ছেলে এসে ওদের পাশের ঝোপটার কাছে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে শুরু করলো। তাদেরই মধ্যে একজন একটা সিগারেট খাচ্ছিল। সিগারেটের ধোঁয়া আর গন্ধ পৌঁছে যাচ্ছিল পারমিতাদের কাছ পর্যন্ত। পারমিতা তাই ছেলেটাকে বারণ করার জন্য উঠে গেল। ছেলেটিকে ডাকাতে ছেলেটি ঘুরে তাকাতেই পারমিতা দেখল এতো সেই ছেলেটি, যে কিছুদিন আগে তাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিয়েছিল।

 পারমিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনি?"

 ছেলেটিও পারমিতার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থেকে বলল, "আরে ম্যাডাম, আপনি এখানে?"

 পারমিতা একটু ধমকের সুরেই বলল, "আগে সিগারেটটা ফেলুন, তারপর কথা বলব।"

 ছেলেটির এতক্ষণ মাথাতেই ছিল না যে তার হাতে সিগারেট রয়েছে। সে হাতের দিকে তাকিয়ে সিগারেটটা তাড়াতাড়ি ফেলে দিয়ে বলল, "ওহ্ হ্যাঁ অবশ্যই, এই যে ফেলে দিয়েছি।"

 পারমিতা বলল, "আপনি এখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন তাতে পাশে যারা আছে তাদের যে অসুবিধা হতে পারে সে খেয়াল আছে?"

 ছেলেটি আলতো আলতো ভাবে বলল, "ওই ম্যাডাম বন্ধুদের সাথে একটু আধটু!"

 পারমিতা এবার নরম সুরে বলল, "আচ্ছা বেশ। আর হ্যাঁ তখন থেকে কি আপনি আমাকে ম্যাডাম-ম্যাডাম করে যাচ্ছেন বলুন তো।"

 ছেলেটি বলল, "না, আসলে আপনি ভদ্র ঘরের মেয়ে। ডাক্তারি পড়ছেন। কিছুদিন পর ডাক্তার হবেন। তাছাড়া মেয়েদের সম্মান জানিয়ে ম্যাডাম বলতে ক্ষতি কি বলুন।"

 পারমিতা বলল, "আচ্ছা, হয়েছে। কিন্তু আপনি আমাকে আর ম্যাডাম বলবেন না। কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, সেদিন রাতে আপনি আমার উপকার করলেন, আবার আজ আপনার সাথে দেখা হয়ে গেলো।"

 ছেলেটি বলল, "আমি তো বলেই ছিলাম ভাগ্যে থাকলে আবারও দেখা হতে পারে।"

 পারমিতা বলল, "দেখেছেন, দুবার আপনার সাথে দেখা হলো কিন্তু আপনার নামটা জানা হলো না।"

 ছেলেটি বলল, "এটি আমারও মিসটেক ছিল। আমার উচিত ছিল আপনার নামটা জানার পর আমার নামটাও আপনাকে জানানো। আমার নাম নীলাদ্রি জানা।"

 পারমিতা বলল, "আচ্ছা নীলাদ্রি আসুন, আমি আপনার সাথে আমার বান্ধবীর পরিচয় করিয়ে দিই।"

 কুহেলীর কাছে গিয়ে পারমিতা বলল, "কুহেলী এ হচ্ছে নীলাদ্রি, সেদিন রাতে উনিই আমাকে হোস্টেল পৌঁছে দিয়েছিলেন। আর নীলাদ্রি ও হচ্ছে কুহেলী, হোস্টেলে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।"

 তিনজন একসাথে বসে গল্পঃ করতে লাগলো। পার্কের একটা ল্যাম্পপোস্টের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নীলাদ্রির মুখে এসে পড়ছিল। সেই আলোতে পারমিতা লক্ষ্য করলো নীলাদ্রির কপালে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি দাগ রয়েছে। সেটা দেখিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, "নীলাদ্রি তোমার কপালে এটা কিসের দাগ, কেটে গেছিলো নাকি?"

 নীলাদ্রি বলল, "এটা কিসের দাগ জানিনা, কিন্তু মা বলে জন্মের সময় থেকেই আছে।"

 কুহেলী মজা করে বলল, "তুমি হারিয়ে গেলেও কিন্তু তোমার ঐ দাগটা দেখে খুব সহজেই তোমাকে চেনা যাবে।"

 নীলাদ্রিও পাল্টা মজা করে বলল, "সেই জন্যই হয়তো ভগবান সহজে আমাকে খোঁজার জন্য এই দাগটা করে দিয়েছে।"

 কিছুক্ষণ গল্পঃ করার পর পারমিতা বলল, "নীলাদ্রি এবার আমাদের যেতে হবে, নইলে হোস্টেলে লেট হয়ে যাবে।"

 নীলাদ্রি বলল, "আচ্ছা, চলুন আমি আপনাদের এগিয়ে দিই।"

 পারমিতা বলল, "না-না, তার দরকার নেই। আমরা চলে যাবো, ওকে বাই।"

 পারমিতারা চলে আসলে নীলাদ্রি সেদিকেই চেয়ে রইলো যতক্ষণ ওদের দেখা যায়।

 এরপর দিন যেতে লাগলো। প্রতি ছুটির দিনেই পারমিতা ও নীলাদ্রি কে দেখা যেত একসাথে পার্কে বসে গল্পঃ করতে। ধীরে ধীরে ওদের আপনি সম্বোধন এসে পৌঁছল তুমিতে। সময় অতিবাহিত হয়ে চলেছে আপন গতিতে। শীত শেষে গাছে গাছে পাতা ঝরে গিয়ে জানান দিচ্ছে বসন্ত এসে গেছে। নতুন নতুন ফুলে ভরে যেতে শুরু করেছে সমস্ত শাখা-প্রশাখা। মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নতুনের আনন্দ। এমনই এক সন্ধ্যায় পারমিতা আর নীলাদ্রি বসে আছে কৃষ্ণসায়রের জলে পা ভিজিয়ে। হঠাৎ নীলাদ্রি পারমিতাকে বলল, "তুমি একটু বসো, আমি এক্ষুনি আসছি।"

 নীলাদ্রি চলে গেলে পারমিতা আর কুহেলী গিয়ে দাঁড়ালো পার্কের ওরা যেখানে বসে ছিল তারই পিছনে একটি জাপানি ম্যাপল গাছের পাশে। ম্যাপল গাছটায় নতুন পাতা আসতে শুরু করেছে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে গাছটিকে। নীলাদ্রি ফিরে এসে দেখল ওরা দুজন দাঁড়িয়ে আছে। 

 নীলাদ্রি পারমিতার সামনে এসে হাতে একগোছা লাল পলাশের সাথে লাল গোলাপ নিয়ে নতজানু হয়ে বসে পারমিতার প্রতি প্রেমপূর্ণ কণ্ঠে বলল, "পারমিতা সেই রাতের আলো আঁধারিতে তোমাকে দেখেছিলাম। তারপর তোমার সাথে চলতে চলতে জানিনা কবে আমার মনের খাতায় তোমার ছবি অঙ্কিত হয়ে গেছে। তোমাকে দেখে বুঝেছি ভালোবাসার অনুভূতি। তুমি কি হবে আমার বসন্তের পলাশ, রাঙিয়ে দেবে আমার জীবনটাকে তোমার লাল আভায়, পথ চলবে আমার সাথে চিরকাল!"

 পারমিতা একভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে কোনদিকে তাকাতে পারছে না। এগুলো কি ও স্বপ্ন দেখছে। ও শুনতে পাচ্ছে পাশ থেকে নীলাদ্রির বন্ধুরা বলে চলেছে ' ইয়েস পারমিতা অ্যাকসেপ্ট হিম।' কুহেলী বলছে, "হ্যাঁ বলে দে।"

 পারমিতা কি করবে বুঝতে পারছে না। লজ্জায় ওর গাল দুটো ঠিক লাল পলাশের মতোই লাল হয়ে গিয়েছে। কেউ কোনোদিন এভাবে ওকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়নি। কিন্তু সে নিজেও তো ভালোবাসতে শুরু করেছিল নীলাদ্রিকে। প্রকাশ করতে পারেনি কোনোদিন। আজ যখন নীলাদ্রি নিজে তার কাছে ভালোবাসার প্রস্তাব রেখেছে তখন সে কেনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এসব ভাবতে ভাবতে সে যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। নীলাদ্রির কথাতে তার ভাব কাটলো - "তুমি কি হবে আমার বসন্তের রানী!"

 পারমিতা কোনো কথা না বলে নীলাদ্রির হাত থেকে পলাশ আর গোলাপগুলো নিয়ে কুহেলীর হাত ধরে লজ্জায় লাল হয়ে ছুটে বেরিয়ে এলো পার্ক থেকে। হোস্টেলে ফিরে সেই রাতে আর ঘুমাতে পারলো না সে। দুচোখের পাতায় শুধু নীলাদ্রির ভালোবাসার প্রস্তাবই জায়গা করে নিল।

  এরপর বেশ আনন্দেই কাটছিল ওদের দিনগুলো। একদিন পারমিতার বাবা জানতে পারলেন ওদের সম্পর্কের কথা। তিনি পারমিতাকে ডেকে বললেন নীলাদ্রিকে একদিন নিয়ে আসতে ওদের বাড়ি। তিনি কথা বলতে চান তার সাথে। সেইমতো পারমিতা একদিন নিয়ে গেল নীলাদ্রিকে তাদের বাড়িতে। 

 পারমিতা নীলাদ্রিকে গেস্টরুমে বসতে দিয়ে চা করার জন্য চলে গেল। নীলাদ্রি টেবিল থেকে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে পড়ছিল। কিছুক্ষণ পরে পারমিতার বাবা ঘরে ঢুকলে নীলাদ্রি সম্মান পূর্বক নমস্কার জানিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

 পারমিতার বাবা নীলাদ্রিকে ইশারাতে বসতে বলে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, "নাম কী তোমার?"

 নীলাদ্রি নাম জানানোর সাথে সাথেই চলে এলো দ্বিতীয় প্রশ্ন, "বাড়ি কোথায়?"

 নীলাদ্রি বলল, "ইন্দ্রপ্রস্থ, বর্ধমান।"

 "বাড়িতে কে কে আছে?"

 "বাবা-মা আর আমি।"

 "কী করা হয়?"

 "আমি এখন টিউশন পড়ায় আর চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।"

 "তার মানে বেকার।"

 নীলাদ্রি কোনো কথা না বলে চুপ করে রইলো।

 "পারমিতাকে কতদিন ধরে চেনো?"

 "তিন বছর থেকে।"

 "শোনো তোমাকে কিছু কথা বলি। ছোটো থেকেই পারমিতাকে আমি খুব যত্ন করে বড় করেছি। ওর কোনোকিছুর অভাব হতে দিই নি। আমার মেয়েকে আমি সেই শিক্ষায় দিয়েছি যে সে আমার কথার অবাধ্য হবে না। আর কিছুদিন পরেই ও ডক্টর হয়ে যাবে। ও হাই-প্রোফাইল লোকেদের সাথে চলাফেরা করবে। তোমার কী যোগ্যতা আছে আমার মেয়ের সাথে বিয়ে করার। আমরা ব্রাহ্মণ, আর তোমরা....? আর হ্যাঁ আমি পারমিতার বিয়ের জন্য উচুঁ ঘরের ছেলে ঠিক করেছি। ওর বিয়ে সেখানেই হবে। আর সেই ছেলেকেও পারমিতার পছন্দ। তাই আজকের পর থেকে আমার মেয়ের কথা ভুলে যাও। আর এরপর দ্বিতীয়বারের জন্য যদি আমার মেয়ের সাথে সম্পর্কের কথা শুনি তাহলে আমি অন্য স্টেপ নিতে বাধ্য হবো।"

 নীলাদ্রি এতক্ষণ মাথা নিচু করে সব শুনছিল। এবার সে বলল, "দেখুন আমি আপনার মেয়েকে ভুলে যাবার জন্য ভালোবাসিনি। আর সেটা আপনার কথাতে হবে সেটাও নয়। আমি যেমন তাকে ভালবাসি সেও আমাকে ভালোবাসে। তাই আমি শুধু তার কথাটাই শুনতে চাই।" কথাগুলো বলে নীলাদ্রি আর দাঁড়ালো না সেখানে।

 নীলাদ্রি চলে যাওয়ার পরে পরেই পারমিতা চা, মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকে নীলাদ্রিকে দেখতে না পেয়ে ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "বাবা নীলাদ্রি কোথায় গেলো?"

 ওর বাবা বলল, "চলে গিয়েছে। অবশ্য চলে গিয়ে ভালোই হয়েছে। দেখ মা, ছেলেটা সুবিধার নয়। ও শুধু তোকে ভালোবেসেছিল টাকার লোভে, তুই বড় ডাক্তার হয়ে অনেক টাকা ইনকাম করবি সেই জন্য। আর ছেলেটার সাথে কথা বলে জানলাম ওর নাকি আরো অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। তোকে ও মন থেকে ভালবাসে নি। ও তোকে শুধু আমাদের সম্পত্তির লোভে ভালো বেসেছে। আমি ওকে বললাম তুই বড় ডাক্তার হোবি, কত নাম করবি, কত বড় বড় লোকের সাথে চলবি। তাহলে ওকেও তো তোর পাশে থাকতে হবে। ওকেও তো ভালো কিছু করতে হবে। কিন্তু ও কি বলল জানিস, বলল তুই ডাক্তার হয়ে ইনকাম করবি সেটাই নাকি সে চাই, আর সে কিছু করবে না। ও শুধু তোর টাকাকেই ভালোবাসে। তুই ভাব ও আমাকে অপমান করে গেলো। আমার সামনে তোকে অপমান করল। তুই ভুলে যা ওই ছেলেকে। ওসব ছোটো ঘরের ছেলেগুলো ওরকমই হয়। তাই আমি চাই না তুই আর ওর কথা মনে রাখিস। আমি তোর জন্য অনেক ভালো একটা ছেলে দেখেছি, তার সাথে তোর বিয়ে দেবো।"

  সেদিন রাতে পারমিতা ঘুমাতে পারলো না। ওর গাল দুটো ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। ফোনটা নিয়ে কল করল নীলাদ্রিকে। ফোন বেজে চলেছে কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। অনেক ফোন করেও সে রাতে আর নীলাদ্রি ফোন ধরলো না। পারমিতা কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না।

 পরদিন সকালে হোস্টেল যাবে বলে ও রেডি হচ্ছিল। কিন্তু ওর বাবা বলল, "এখন কদিন তোকে কলেজ যেতে হবে না, আমি প্রিন্সিপাল এর সাথে কথা বলে নেব। আর ওই ছেলেকে তুই ভুলে যা। আমি চাই না তুই আর ওই খারাপ ছেলের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখ। তুই তো জানিস আমি যা করব তা তোর ভালোর জন্যই করব। তুই কি চাস বল আমাকে ছেড়ে ওই খারাপ ছেলেটার সাথে সম্পর্ক রাখতে।"

 পারমিতা কোনো কথা বলতে পারল না। ওর দুচোখ বেয়ে শুধু জল ঝড়ে পড়ল।

  এরপর এক সপ্তাহ দুজনের মধ্যে কোনো যোগাযোগ রইলো না। কিছুদিন পর কলেজের একটা দরকারে পারমিতা হোস্টেলে গেল। সেদিন বিকেলে হটাৎ নীলাদ্রির ফোন এলো পারমিতার কাছে। নীলাদ্রি ফোনে বলল পার্কে দেখা করতে কিছু কথা আছে।

 প্রায় সন্ধ্যার আগে পারমিতা পার্কে গিয়ে দেখল নীলাদ্রি একটা গাছের নীচে ঘাসের ওপর বসে আছে।

 পারমিতা কাছে গিয়ে বলল, "বলো কি বলবে বলছিলে?"

 নীলাদ্রি পারমিতাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "পারমিতা তোমার বাবা তোমাকে কী বলেছে জানি না, কিন্তু তুমি কি আমাকে খারাপ মনে করো। তুমি কি মনে করো আমি তোমার অযোগ্য?"

 পারমিতা বলল, "তুমি আমার যোগ্য নাকি অযোগ্য সেগুলো আমি কোনোদিনও ভাবিনি। আমি শুধু তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু তুমি, তুমি আমাকে মন থেকে ভালোবাসো নি। তুমি আমাকে অপমান করেছ, আমার বাবাকে অপমান করেছ। তাই আমি ঠিক করে নিয়েছি বাবা যে ছেলেকে পছন্দ করে দেবে তাকেই বিয়ে করব।"

 নীলাদ্রি পারমিতার হাতটা ধরে বলল, "তাহলে আমাদের ভালোবাসার কি হবে?"

 পারমিতা বলল, "সেটা তোমার আগে বোঝা উচিত ছিল। আমি সেদিন রাতে খুব কষ্টের মধ্যে ছিলাম। অনেকবার ফোন করেছি তোমাকে, কিন্তু তুমি তার কোনো উত্তর দাওনি। আজ এক সপ্তাহ তুমি কোনো খবর পর্যন্ত নাওনি।"

 "দেখো পারমিতা সেদিন তোমার বাবা আমাকে যে কথাগুলো বলেছিলেন তাতে আমার মাথার ঠিক ছিল না। তাই হয়তো তোমার ফোন ধরতে পারিনি। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলে যাবো এটা কোনোদিনও ভাবিনি।" নীলাদ্রি পারমিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করল।

 "সত্যি কথা তো এটাই তুমি আমাকে কখনো ভালোইবাসোনি, তুমি আমাকে ব্যাবহার করতে চেয়েছ।"

 "এটা তুমি কি বলছ পারমিতা, আমি তোমাকে ব্যাবহার করতে চেয়েছি? তুমি এমনটা ভাবতে পারলে?"

 "নীলাদ্রি তুমি আমাকে ভুলে যাও। আমি পারবো না আর তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে।"

 "পারমিতা আমরা যে এতো সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়েছি সেই স্মৃতিগুলোর কি হবে? আমাদের সম্পর্কের কি হবে? আমাদের স্বপ্ন গুলোর কি হবে? তার কি কোনো মূল্য নেই?"

 "আমাকে ক্ষমা করে দিও, আর আজ থেকে পারমিতা নামটা ভুলে যেও।" কথাটা বলে পার্ক থেকে চলে এলো পারমিতা। সেই রাতে সে খুব কেঁদেছিল। সত্যিই কি কোনোদিন সে ভুলতে পারবে নীলাদ্রিকে। এরপর নীলাদ্রির আর কোনো খোঁজ পায়নি সে। তারপর সে ডক্টর হলো, বাবার দেখা ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে গেল তার। আর অপর দিকে পারমিতার বিয়ের বছর দুয়েক আগে নীলাদ্রি এসেছিল দুর্গাপুরে কাজের সন্ধানে।

  পুরোনো দিনের সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠলো পারমিতার। চোখের সামনেটা আবছায়া থেকে অন্ধকার হয়ে উঠলো। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখল সে একটা নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে আছে। তাকে উঠে বসতে দেখে রনিত এগিয়ে এসে বলল, "এখন কেমন বুঝছো।"

 পারমিতা বলল, "ভালো। রনিত ওই লোকটা কোথায়?"

 পাশেই পরেশবাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি বললেন, "ম্যাডাম আপনি ওতো চিন্তা করবেন না। সে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়, আছে কোথাও।"

 পারমিতা বলল, "ও যেখানে থাকে সেখানে আমাকে একবার নিয়ে যাবেন?"

 পরেশবাবু বললেন, "কিন্তু ম্যাডাম আপনি ওখানে গিয়ে কি করবেন?"

 পারমিতা বলল, "আমার দরকার আছে, আপনি আমাকে নিয়ে চলুন।"

 রনিত বলল, "পারমিতা তোমার শরীরের অবস্থা ভালো নয়।"

 পারমিতা অনুনয়ের সুরে বলল, "আমি ভালো আছি রনিত, প্লিজ আমাকে একবার নিয়ে চলো।"

 অতঃপর ওরা শহরের একপাশে একটি বিশাল বটগাছের কাছে গিয়ে পৌঁছলো। গাছের নীচে বটের ঝুড়ির ফাঁকে কিছু কাপড় দিয়ে একটি ঝুপড়ির মতো করা।

 পরেশবাবু একজন লোককে বললেন, "দেখো তো ভিতরে গিয়ে লোকটা আছে নাকি।"

 লোকটি ফিরে এসে বলল, "না স্যার সেই পাগলটা তো নেই, তার কোনো জিনিস ও নেই। তবে এই কাগজটা পরে ছিল।

 পারমিতা লোকটির হাত থেকে কাগজটা নিয়ে দেখল তাতে কিছু লাইন লেখা রয়েছে। পড়তে পড়তে পারমিতার চোখে জল চলে এলো - 

         "হেরিছ যারে সবার মাঝে 

                    চেয়েছো যারে চিরকালে;

           যদি তারে করো হৃদয়ের প্রেম 

                     দেখা হবে তবে মনের অন্তরালে।।"






লেখক - অরিন্দম বিশ্বাস





 

 









সোমবার, ২২ নভেম্বর, ২০২১

বাদশা

 পুরাতন অশ্বথ গাছের নীচে বিশ্রাম নিচ্ছিল বাদশা। বয়স হয়েছে তাই আর বেশি পরিশ্রম করতে পারে না সে। নিস্তব্ধ তপ্ত দুপুরে এই গাছতলায় তার আশ্রয়। রহিম ডাক দিতেই চিঁ-হি স্বরে আওয়াজ করে ছুটে এলো বাদশা। রহিম তার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল। রহিমের বাড়ি হল মুর্শিদাবাদ শহরের এক প্রান্তে একটি গ্রাম্য এলাকায়। বাদশার সাথে সাথে রহিমেরও বয়স হয়েছে। সে বিপত্নিক হয়েছে বছর পঁচিশ হল। তার সংসারে আছে এক ছেলে, ছেলের বউ আর তার জীবনের সঙ্গী বুড়ো ঘোড়াটা। 

  অভাবের সংসার রহিমের। ছোট থেকেই সে দেখে এসেছে চরম দুর্ভিক্ষ ও দুর্দিন। তার পূর্ব-পুরুষরা নবাবের জমিদারিতে দিন মজুরের কাজ করতো। নবাবদের দিন শেষ হয়েছে, জমিও হাত বদল হয়েছে। তাই আর জমিতে চাষ করে সংসারের হাল ধরা হয়নি রহিমের। এক সময় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করে সে। এক সন্তানের জন্ম দেবার পর এক কঠিন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরে তার স্ত্রী। কিন্তু টাকার অভাবে স্ত্রীর চিকিৎসা করে উঠতে পারে নি রহিম। অবশেষে তার স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে।

  দারিদ্রের আতিশয্যে আর চলতে না পেরে অবশেষে সরকারের কাছে আর্জি জানিয়ে কিছু টাকা পায় রহিম। সেই টাকায় সে ঘোড়াটি কেনে স্থানীয় এক ঘোড়া ব্যাবসায়ীর কাছ থেকে। নবাবের শহর, তাই ঘোড়াটিরও নবাবী নামকরণ করা উচিত। অনেক ভেবে সে ঘোড়াটির একটা পছন্দসই নাম দিল - বাদশা। তার যত্নের কোনো ত্রুটি হতে দেয়নি রহিম। আস্তে আস্তে বড়ো হয়েছে বাদশা। শরীরের সাথে সাথে তার শক্তিও বুদ্ধির ও বৃদ্ধি হয়েছে। নামও তার যেমন বাদশা, তার চাল চলন ও আচরণও বাদশার মতোই।

  এই বাদশাই রহিমের সংসারে দুবেলা অন্ন জুগিয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে ঘুরতে আসা মানুষজনকে তার কাঁধে করে বয়ে নিয়ে বেরিয়েছে মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে, নবাবের প্রাসাদে। সে যেমন পিঠে করে ভার বইতে পারতো, তেমনি ঘোড়া প্রদর্শনী বা ঘোড়দৌড় এও তার নাম থাকত সবার আগে। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় বাদশা মাঠে নামলে লোকজনের মুখে একটা কথায় শোনা যেত - "আজ খেতাব বাদশাই জিতবে"।

  জীবনের পঁচিশটা বছর পার করে এসেছে বাদশা। বয়সের ভারে আজ সে জীর্ণ, শরীর শীর্ণকায়, শক্তি ও কমে এসেছে। সে আর পারে না দ্রুত দৌড়তে, পারে না মানুষকে পিঠে নিয়ে ঘুরতে। 

  রহিমের ছেলেও বড়ো হয়েছে। বছর দুয়েক হলো তার বিয়ে দিয়েছে রহিম। পুত্রবধূই এখন বাড়ির সমস্ত কাজ দেখাশোনা করে।

  যৌবনকালে বাদশা কোনো অভাব বুঝতে দেয়নি রহিমকে। কিন্তু এখন সে আর পারে না। মানুষ ও আর টাঙাই উঠতে চায় না। ছোট দূরত্ব যেতে তাদের পছন্দ রিকশা বা টোটো। সবাই টোটো কিনেছে কিন্তু রহিম পারে নি তার পুরোনো পেশা আর বাদশাকে ছাড়তে। এ নিয়ে ছেলের বউ এর কাছে প্রতিদিন কথাও শুনতে হয় রহিমকে। পুত্রবধূ সটান তার মুখের উপর বলে দেয় - "সবাই টোটো কিনেছে, আপনি কেনো সেই মান্ধাতা আমলের টাঙা আঁকড়ে বসে রয়েছেন। বুড়ো ঘোড়াটা বিক্রি করে দিলেও তো দুটো পয়সা হয়।"

  পুত্রবধূর কথায় আড়ালে চোখের জল ফেলে রহিম। উপর থেকে যিনি সব দেখছেন, তার দিকে মুখ তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে জিজ্ঞাসা করে রহিম - "হায় আল্লাহ! বুড়ো হলে কি সকলেরই এভাবে প্রয়োজন ফুরোয়। রোজগার না করতে পারলে কি তারও সংসারে প্রয়োজন ফুরত।"

  বউমার বয়স অল্প, তার উপর এ সংসারে বেশিদিন আসেনি। তাই সে জানে না এ সংসারে বাদশার অবদান। বাদশার প্রতি বড়ো মায়া তার। সেই ছোট্ট থেকে বড়ো করে তুলেছে সে বাদশাকে। বাদশাও থেকেছে সব সময় তার সঙ্গে। বাদশার জন্য কোনোদিন তাকে অভুক্ত থাকতে হয় নি। কিন্তু আজ বাদশা বুড়ো হয়েছে বলে তাকে বিক্রি করে দেবে! কী করে তাকে অন্যের হতে তুলে দেবে সে! কিছু টাকা না হলে যে আর সংসার চলে না। জীবন আজ তাকে এক চরম সংকটে এনে ফেলেছে। টোটো কিনলে হয়তো সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরবে। কিন্তু বাদশাকে হারাতে হবে চিরতরে।

  রহিমের ডাক শুনে বাদশা ছুটে আসে তার কাছে। রহিম জড়িয়ে ধরে বাদশাকে। অপাঙ্গে তাকায় তার দিকে। রহিম দেখে বাদশাও তার দিকে চেয়ে আছে সজল নয়নে।

  এখন প্রায় দিনই অভুক্ত থাকতে হয় বাদশাকে। কিন্তু সে জন্য কোনো অভিযোগ তার নেই। দিন দিন খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে সে। আস্তে আস্তে চলার ক্ষমতা ও হারিয়ে ফেলে বাদশা। সে বুঝতে পারে, সে যেন এ সংসারে একটা দায় হয়ে পরেছে। যতদিন তার ক্ষমতা ছিল ততদিন সবার মন জুড়ে ছিল সে। কিন্তু এখন তার যাবার সময় হয়েছে।

  অভাবের সংসারে রহিম ও আর পারে না বাদশার খাবার জোগাতে। রহিমের দিকে তাকিয়ে বাদশার দু-চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। বাদশাও চায় তার প্রভুর উপর থেকে তার অতিরিক্ত দায় মুছে ফেলতে।

  সজল নয়নে রহিম এসে বসে তার পাশে। হাত বুলায় তার শরীরে। প্রভুর এই স্পর্শ টুকুর অপেক্ষাতেই যেন ছিল বাদশা। ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। রহিমের সংসার থেকে তার দায় মুছে ফেলতে এ পৃথিবীকে বিদায় জানায় বাদশা।


                                                           লেখক

                                                      অরিন্দম বিশ্বাস

বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আলো

    ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে তাড়াতাড়ি জামাটা পাল্টে আবার বেরিয়ে গেল শাক্য। আজ অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁর মালিক আবার খুব খিটখিটে মেজাজের। সময় মতো না গেলে কথা শুনতে হবে। শাক্য কলেজের পড়া শেষ করে কলকাতায় এসেছে চাকরির সন্ধানে। সারাদিন বিভিন্ন অফিসে ঘোরাঘুরি করে, ইন্টারভিউ দেয় চাকরির আশায়। কিন্তু প্রতিবারই ভাগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। বিকেলে একটা রেস্তোরাঁতে ওয়েটারের কাজ করে নিজের ও পরিবারের খরচ  জোগায় শাক্য। 
    পরিবার বলতে আছে এক অসুস্থ মা ও এক বোন। বোনের বিয়ের বয়স হয়েছে। কিছুদিন আগেই শাক্য তার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। কারণ বোনের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, তাদের আপ্যায়ন করতে হবে। পাত্র সরকারি চাকরি করে। শাক্য ও তার মায়ের পাত্র পছন্দ। কিন্তু পাত্র মোটা রকম পণ না পেলে বিয়ে করতে রাজি নয়। দু'লাখ টাকা নগদ, সোনার গহনা, খাট-বিছানা, আসবাবপত্র এটা ওটা নিয়ে পাত্রের বিভিন্ন রকম আবদার দেখে মনে হতে পারে নিজেকে দরদামের জালে আবদ্ধ করে যেন নিজেকে বাজারের পণ্য করে তুলেছে। পাত্রের দরদাম শুনে শাক্যর বোন বিয়েতে মানা করে দিয়েছিল। কিন্তু শাক্য পাত্রের বাবাকে কথা দিয়েছে সে তাদের সব পণ মিটিয়ে দেবে বিয়ের দিন। আর তাই তার একটা কাজ খুব দরকার। 
    
    রেস্তোরাঁয় পৌঁছতেই মালিক বলল- "এরকম দেরী করে কাজে আসলে চলবে না। সময়মতো না আসতে পারলে তোমাকে আর কাজে রাখা যাবে না" ।
    শাক্য মাথা নীচু করে বলল- "সরি স্যার, আজ ইন্টারভিউ দিয়ে আসতে দেরী হয়ে গিয়েছে" ।
    রেস্তোরাঁর মালিক আবার জোর গলায় বলল- "তোমার ইন্টারভিউ এর জন্য তো আমি আমার ক্ষতি করতে পারব না"।
    শাক্য অনুরোধ জানালো- "আর দেরী হবে না স্যার, দয়া করে আমাকে কাজ থেকে বাদ দেবেন না" ।
    মালিক এবার একটু নরম হয়ে বলল- "ঠিক আছে যাও কাজ করো, এরপর থেকে যেন আর দেরী না হয়" ।
    শাক্য মাথা নীচু করে চলে গেল। রেস্তোরাঁ থেকে ফিরে নিজের জন্য চাল আর আলু একসাথে ফুটিয়ে নিল। প্রতিদিন বিভিন্ন রকম সুস্বাদু খাবার চোখে দেখে সে, নিজের হাতে অন্যদের টেবিলে সেগুলো পৌঁছে দেয়। কিন্তু তার কপালে সেই ভাত আর আলু।
    খাওয়া সেরে ঘুমানোর আগে বই পড়াটা শাক্যর নেশা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও একটা রবীন্দ্র উপন্যাস নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা নিয়ে দেখল সুমি ফোন করেছে।
    "হ্যাঁ সুমি বল"- ফোনটা ধরে বলল শাক্য। 
    ফোনের ওপার থেকে কন্ঠ ভেসে এল- "দাদা কিছুদিন হল মায়ের শরীর খারাপটা বেড়েছে, ওষুধ শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই যদি কিছু টাকা পাঠাতে পারিস তাহলে ওষুধ কেনা হত" ।
    শাক্য বলল- "ঠিক আছে, মাকে বলিস আমি দুদিনের মধ্যে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করবো। মা কি ঘুমিয়ে গিয়েছে ?"
    সুমি উত্তর দিল- "হ্যাঁ, তুই কথা বললে কালকে সকালে ফোন করবো" ।
    "থাক, আর ফোন করতে হবে না। আমি টাকা পাঠিয়ে দেব। মা'র খেয়াল রাখিস" ।
    "ঠিক আছে দাদা রেখে দিলাম " ।
    ফোনটা রেখে বইটা বন্ধ করে দিল শাক্য। আজ আর পড়তে ইচ্ছে করছে না। দুদিনের মধ্যে কিছু টাকা তাকে জোগাড় করতেই হবে।
    পরদিন সকালে কাজের খোঁজে অফিসে অফিসে না গিয়ে সে ঠিক করলো আজ তাড়াতাড়ি রেস্তোরাঁতে যাবে। একটু বেশি কাজ করে কিছু টাকা জোগাড় করতে হবে। সেদিন এত তাড়াতাড়ি শাক্যকে রেস্টুরেন্টে দেখে মালিক জিজ্ঞেস করলেন- "কী ব্যাপার শাক্য, আজ এত তাড়াতাড়ি ?"
    শাক্য দেখলো মালিকের মনটা আজ ভালো আছে। তাই কথাটা সে বলে ফেলল- "স্যার মায়ের অসুখটা বেড়েছে। ওষুধ কিনতে হবে। আপনি যদি অগ্রিম কিছু টাকা দেন, তাহলে....। আমি বেশি বেশি কাজ করে শোধ করে দেব" ।
    মালিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল- "ঠিক আছে, যাওয়ার সময় হাজার চারেক টাকা নিয়ে যেও" ।
    শাক্য বিনয়ের সাথে বলল- "স্যার আমার খুব উপকার করলেন। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ " ।
    মালিক বলল- "ঠিক আছে, এখন যাও কার কি লাগবে দেখো" ।
    পরদিন টাকাটা ট্রান্সফার করে দিয়ে সুমিকে ফোন করলো শাক্য-
    "হ্যাঁ দাদা বল" ।
    "টাকাটা পেয়েছিস ?"
    "হ্যাঁ পেয়েছি" ।
    "ঠিক আছে তাহলে মায়ের ওষুধ আর যা যা লাগবে কিনে নিস" ।
    "ঠিক আছে" ।
    "মায়ের দেখাশোনা করিস ভালো করে, এখন রাখছি" ।

    বিভিন্ন অফিস ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে শাক্য। কিন্তু সকল জায়গাতেই বিধাতা বিমুখ। সে ভাবতে থাকে শিক্ষার কোনো মূল্যই নেই বর্তমান সমাজের কাছে। যে কোনো কাজ পেতে গেলে এখন হয় টাকা থাকতে হবে নয়তো ঘনিষ্ঠ মহল। যার কোনোটাই তার নেই। উপযুক্ত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সব অফিসেই কোনো না কোনো দুর্বলতা দেখিয়ে শাক্যকে বঞ্চিত করা হয়। বিত্তবান শ্রেণীরা চিরকালই দ্রারিদ্রের প্রতি নির্দয়। 
    সরকারও নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। ভাবী যুবসমাজের প্রতি সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। প্রতিটি রাজনৈতিক দল উচ্চ ভাষণে মঞ্চ মাতিয়ে তোলে। কিন্তু গরীবের দুঃসময়ে সবাই হয়ে যায় ডুমুরের ফুল। আর গরীব, অসহায় মানুষগুলো বসে থাকে তীর্থের কাক হয়ে।
    এইসব ভাবতে ভাবতে শাক্যর মনে আশার আলো যখন প্রায় অস্তমিত তখন একটা চিঠি এসে পৌঁছলো। শাক্য চিঠিটা খুলে দেখলো একটা কর্পোরেট কোম্পানী তাকে ইন্টারভিউ এর জন্য ডেকেছে। পরদিন সে ভালো করে প্রস্তুতি নিয়ে কোম্পানীর অফিসে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ম্যানেজার তার ঘরে ডাকলেন শাক্যকে। কিছু প্রাথমিক কথোপকথনের পর ম্যানেজার শাক্যকে বললেন- "অভিনন্দন! আজ থেকে আপনি আমাদের কোম্পানীর প্রোডাক্ট ইনচার্জ। আগামীকাল থেকে নতুন কর্মজীবন শুরু করুন " ।
    
প্রথম দিন কাজে গিয়ে নিজের দায়িত্ব বুঝে নিল শাক্য। অফিসে প্রথম দিন, তাই সমস্ত দিক দেখাশোনা করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। অফিস থেকে বেড়িয়ে সে ফোন করে বাড়িতে খবরটা দিল- 
    "হ্যালো ! সুমি তাড়াতাড়ি মাকে ফোনটা দে" ।
    সুমি বলল- "হ্যাঁ ধর দিচ্ছি" ।
    "হ্যালো ! শাক্য, বল বাবা, কেমন আছিস ?" শাক্যর মা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
    "হ্যাঁ মা আমি ভালো আছি। তোমার শরীর ঠিক আছে তো?"
    "এখন বেশ ভালো বোধ করছি রে। তোর আর সুমির একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলে একটু শান্তি পায় রে বাবা" ।
    "মা তুমি আর চিন্তা করোনা। আমি একটা কোম্পানীতে চাকরি পেয়ে গিয়েছি"।
    "সত্যি বলছি বাবা শাক্য ?"
    "হ্যাঁ মা আমি সত্যি বলছি" ।
    "তাহলে এবার সুমির বিয়েটা হবে বল" ।
    "হ্যাঁ মা সব হবে, এবার খুব ধুমধাম করে সুমির বিয়ে দেবো, তুমি সাবধানে থেকো, আমি খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি আসছি, এখন রাখছি তবে"।
    ফোনটা রেখে শাক্য দেখলো চারিদিক বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বৃষ্টি হবে মনে হয়। রাস্তায় কোনো অটোও আসছে না। তাড়াতাড়ি পা চালাতে লাগলো শাক্য। কিছুদূর যেতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। শাক্য কিছুটা দৌড়িয়ে একটা বন্ধ দোকানের শেডের তলায় গিয়ে দাঁড়ালো। রাস্তার আলোতে পাশের বট গাছের ছায়া পড়ে একটা রোমাঞ্চকর আলো-আঁধারি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার কন্ঠে ধ্বনিত হল কবিগুরুর 'অনন্ত প্রেম'- 
    "তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার 
    জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার। 
    চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার-
    কত রূপ ধরে পড়েছো গলায়, নিয়েছ সে উপহার 
    জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার" ।

    শাক্য যখন কবিতায় মগ্ন তখন হঠাৎই একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ালো অপর প্রান্তে। ছায়ামূর্তিটি যে একজন নারী সেটা বোঝায় যায়। দেখে মনে হল বিবাহিতা। সিঁথিতে সিঁদুর, পরনে হালকা হলুদ রঙের শাড়ি। আবছায়া আলোতে যেটুকু দেখা যায় তাতে শাক্য ছায়ামূর্তিটিকে ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারলো। কারণ ঐ মুখ, ঐ চোখ, ঐ শরীরী ভাষা যে কোনোদিন ভোলার নয়। ছায়ামূর্তিটিও যে ওকে চিনতে পেরেছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হল না।
    বৃষ্টির জোড় আরো বেড়েছে। জলের ছিটা এসে দুজনেরই গায়ে লাগছে। পরস্পরের প্রতি দূরত্বটা আরো কমে এলো। চারিদিকে আলো-আঁধারি খেলা চলছে, রাস্তা নির্জন, একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ মিশে রয়েছে বাতাসে। দুজন দুজনের দিকে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে। চাইলেই অনেক কিছুই বলা যেত- কিন্তু একটা কথাও বলা গেলো না।
    দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে রইল। নিস্তব্ধ পরিবেশে শুধু বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। শাক্যর মনের ভিতর থেকে আপনা থেকেই বেরিয়ে এল 'একরাত্রি'-র একটি লাইন-
    "সুরবালা আজ তোমার কেহই নয়, কিন্তু সুরবালা তোমার কী না হইতে পারিত" ।
    সত্যিই সুরবালার মতো চন্দ্রাণীও শাক্যর কী না হতে পারত। একটা সময় চন্দ্রাণীই ছিল শাক্যর জীবনের অন্তরঙ্গ, সবচেয়ে নিকটবর্তী, তার জীবনের সমস্ত কিছুর ভাগীদার। সে আজ এত দূর, এত পর, আজ তাকে দেখা বা কথা বলা দোষের, তার বিষয়ে চিন্তা করা পাপ।
    শাক্য যখন কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র তখনই প্রথম আলাপ হয় চন্দ্রাণীর সাথে। তারপর ধীরে ধীরে আলাপ পৌঁছে যায় প্রেমালাপে। চন্দ্রাণীর বাবা বিষয়টা মেনে নেয়নি শাক্যদের পরিবারের অবস্থা জেনে। চন্দ্রাণী অনেকবার বলেছে 'চলো আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিই' । কিন্তু শাক্য প্রতিবারই তাকে মানা করেছে, বলেছে 'মা ও বোনকে ছেড়ে সে পালিয়ে যেতে পারবে না। তাছাড়া সে কাপুরুষের মতো পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে রাজি নয়। নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সম্মানের সাথে দুটো পরিবারকে এক করতে চায় সে' ।
    কলেজ শেষ হবার পর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি চন্দ্রাণীর সাথে। আজ আবার অনেকদিন পর এত কাছাকাছি এসেছে চন্দ্রাণী, কিন্তু অপরের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন তাদের দুজনকে মোহিত করে রেখেছে। চন্দ্রাণীর শরীরের মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছে শাক্য। চন্দ্রাণীও যেন আজ সমস্ত কিছু ছেড়ে তার জন্যই এসে দাঁড়িয়েছে তার কাছে। সারা জীবনের না পাওয়াকে ভুলিয়ে দিয়ছে এই ক্ষণিকের কাছে আসা। এই মুহূর্তটা শুধুই তাদের দুজনের। 
    বৃষ্টি থেমে এসেছে, আকাশও কিছুটা পরিস্কার হয়েছে। শাক্য মৃদু স্বরে প্রথম কথাটা বলল- "বৃষ্টি থেমে গিয়েছে" ।
    চন্দ্রাণী সম্বিত ফিরে পেল শাক্যর কথায়। আবছায়া আলোতেও তার চোখের কোনটা চিকচিক করে উঠল। কোনো কথা না বলে চন্দ্রাণী এক পা শাক্যর দিকে এগিয়ে এল তারপর নরম স্বরে বলল- "আমি আসি"। এরপর সে চলে গেল তার বাড়ির দিকে।
    এই ক্ষণকালটুকু শাক্যর জীবনে এক অনন্ত পাওয়া হয়ে রয়ে গেল। আজ এতগুলো ভালো তার জীবনে একসাথে আসবে সে ভাবতেই পারেনি। এই অন্ধকারেও শাক্যর মনে হাজার প্রদীপের আলো জ্বলে উঠল। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে দেখল মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ সমস্ত পৃথিবীটাকে আলোকিত করে তুলেছে, আর এক চাঁদ যেন শাক্যকে নতুন করে বাঁচার আলো দেখিয়েছে।


                                                       লেখক 
                                                  অরিন্দম বিশ্বাস 


রেফারেন্স: গীতাঞ্জলি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
                 শেষের কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বোঝা

  দেওয়ালের দোলক ঘড়িতে সবেমাত্র সকালের ছয়টার ঘন্টাটা পড়েছে। হঠাৎ একটা কোলাহলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ঘনশ্যামের। শীতের সকাল, তাই বিছানার মায়া ত্যাগ করতে ইচ্ছা করল না তার। বিছানায় শুয়েই সে শুনতে পেল তার পুত্রবধূর তীব্র ভর্তসনা। 
  "তোমার ওই বুড়ো বাপটাকে আর কতদিন সহ্য করতে হবে আমায়...."
  "দেখো মালতী, বাবা তো আর কটা দিন বাঁচবেন, তারপর...."
  "তোমার কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। একটা কাজও করে না বুড়ো, সংসারে এখন আর একটা টাকাও তো দেয় না। কোথায় ভেবেছিলাম তোমাকে বিয়ে করে শুধু তুমি আর আমি শান্তিতে বাস করব। কিন্ত আমাকে ওই বুড়োটার সেবা যত্ন করে খেটে মরতে হচ্ছে।"
  
  এই ঘটনা নতুন নয়। বৌমার এই ধরনের কথাগুলো ঘনশ্যামের কান সওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্ত আজ যেন কথাগুলো তার বুকে কাঁটার মতো বিঁধল। কোনোরকমে বিছানা থেকে উঠে প্রাতঃভ্রমণের জন্য বেরিয়ে গেল সে।
  আজ একটু বেশি হাঁটার জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। তার উপর বৌমার কথাগুলো তার অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে এই শীতেও ঘামিয়ে তুলল তাকে। তাই একটা গাছের তলায় বসে পড়ল ঘনশ্যাম। সকালটা এখন বেশ সুন্দর লাগছে তার। স্নিগ্ধ মনোরম বাতাস ও নাম না জানা পাখির কলরব ভরিয়ে তুলেছে সকালটাকে। 
  "আহঃ! কি শান্তি এখানে। বাড়ি ফিরেই তো আবার জর্জরিত হতে হবে বৌমার বাক্যবাণে। তার চেয়ে ভালো এখানেই কিছুটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যাক।"_ কথাগুলো মনে মনে বলল ঘনশ্যাম।
  বেলা বেশ বেড়েছে। শহরের রাস্তাটাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সঙ্গে হালকা ক্ষিদেও পেয়েছে তার। এবার বাড়ি ফেরা দরকার। 

  ঘনশ্যাম বাড়ি ফিরে এসে দেখলো দীপায়ন বাড়িতে নেই, অফিসে গেছে হয়তো। বৌমা নিজের ঘরে। ক্ষুধার জন্য পেটের ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠলেও বৌমার সকালের আচরণের জন্য সে কিছু বলতে সাহস পেল না। ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ল নিজের বিছানায়।
  শুয়ে শুয়েই ঘনশ্যাম শুনল ঘড়িতে পরপর বারোটা ঘন্টা পড়ল। মানে এখন দুপুর বারোটা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্নান সেরে নিলাম সে। রাস্তার ধারের বারান্দাটাই একটু রোদ এসে পড়েছিল। সেখানটাই গিয়ে দাঁড়াল সে।
  দুপুরে অবশ্য নিরন্ন থাকতে হয়নি তাকে। খাবার টেবিলে ভাত দিয়ে বৌমা বলেছিল_ "আমি ভাত নিয়ে বসে থাকতে পারবো না, খাবার ইচ্ছা হলে এসে খেয়ে যেতে হবে।"
  ঘনশ্যাম কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে উঠে এসেছিল। 

  বিকেলে ঘনশ্যাম নিজের ঘরে বসে সঞ্চয়িতা-র পাতা উল্টাচ্ছিল। তখন দীপায়ন ঘরে এসে ঢুকল। ঘনশ্যাম তার পায়ের শব্দ পেয়ে বলল- "দীপু, কিছু বলবি ?"
  দীপায়ন কিছুটা সঙ্কোচের সঙ্গে বলল- "বাবা তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছিলাম।"
  "তা বল না, কি বলতে এসেছিস ?"
  "বাবা তুমি কিছু মনে করোনা। তোমার বৌমা বলছিল তোমাকে যদি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা যায়....। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। তাছাড়া আমি প্রতি মাসে গিয়ে তোমার খবর নিয়ে আসব।"_ কথাটা বলে দীপায়ন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
  "দেখ দীপু, আমার বয়স হয়েছে। কাজকর্ম করতে পারি না, সংসারে টাকাও দিতে পারিনা। তাই তোরা আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে চাইছিস তো। দীপু এই বাড়িটা এখনো আমার। আমি চাইলে তোরা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবি। কিন্ত আমি সেটা করতে পারবো না। কারণ টা কি জানিস ? কারণ আমি তোর বাবা। তোদের কাছে আমি এখন বোঝা তাই না রে ? তোদেরকে আমার চিন্তা করতে হবে না। তুই এখন যা, আমাকে একটু একা থাকতে দে।"_ একটানা কথাগুলো বলল ঘনশ্যাম।
  দীপায়ন কোনো কথা না বলে ঘর থেকে চলে গেল। কিছুক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থাকল ঘনশ্যাম। তারপর প্রায় আবছা হয়ে আসা চশমা ও পেতলের বাঁট লাগানো লাঠিটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। পড়ন্ত বিকেলের হালকা রোদে গঙ্গার ধারে কংক্রিটের বেঞ্চটায় গিয়ে বসল। আজকে জায়গাটা একদমই নিস্তব্ধ। 
  তার ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল_"বোঝা!" সত্যিই সে আজ পরিবারের বোঝা হয়ে উঠেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘনশ্যাম চাপা গলায় বলল- "সুষমা তুমি তো অনেকদিন আগেই ওদের বোঝার ভার কমিয়ে দিয়ে চলে গেছো। তোমার ছেলে আজ তার বাবার বোঝা বইতে অক্ষম। তাই আমিও তাদের বোঝা হালকা করে দেবো।"
  দু'চোখ ছলছল করে উঠল ঘনশ্যামের। এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা বিষাক্ত মনে হল তার। চশমা আর লাঠিটা বেঞ্চে রেখে উঠে দাঁড়াল সে। চারিদিকটা একবার ভালো করে দেখে নিল।
  হঠাৎ নিস্তব্ধ গঙ্গার জলে ঝপাৎ করে একটা শব্দ। তারপর সব মিলিয়ে গেল। ঘনশ্যাম তার পুত্র ও পুত্রবধূর কাঁধ থেকে বোঝা হালকা করে দিল।
  সত্যিই তো, আজও কত পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মা তার সন্তানদের কাছে বোঝা হয়েই রয়ে গেল।


                                                          লেখক 
                                                    অরিন্দম বিশ্বাস 

অন্তরালে

      ছোট্ট থেকেই ডাক্তার হয়ে দুঃস্থ লোকেদের সেবা করাই ছিল পারমিতার স্বপ্ন। তাই হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেই প্রস্তুতি শুরু করে দ...